Saturday, 2 March 2019

কোলা ব্যাঙে তবলা বাজায়
ফিঙে নাচে গাছে।
কাতলা মাছের বড় মাথায়
ফড়িং চড়ে নাচে।।

Wednesday, 13 February 2019

চল যায় বসন্তের দেশে

চল যায় বসন্তের দেশে

আব্দুল মান্নান মল্লিক

আমাদের এ-ই বৈচিত্র্যময় বাংলা, সারা বিশ্বের মধ্যে অন্যতম। ছয় ঋতুর ষড়ঋতু, অর্থাৎ শেষ ঋতু বসন্ত। ছয় ঋতুর পাঁচ ঋতুকে বিভিন্ন রূপ-জৌলুষে দেখলেও; বসন্তের রূপ-জৌলুষ একেবারেই অন্যতম। 
তবে একেবারে না বললেই নই। কার না ভালো লাগে, বসন্তের হাত ধরে; পায়ে পা মিলিয়ে চলতে? 
আসতে না আসতেই মনে পড়ে যায়; কোকিলের কুহু-কুহু মধুর বোল। বসন্তের দূত বলতে কোকিলের সাথেই আমরা বেশী পরিচিত। বসন্তকাল ছাড়াও কম-বেশি এদের-কে বছরের অধিকাংশ সময়ই ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থাকতে দেখা যায়।  এমনও কিছু পাখি আছে যে, একমাত্র বসন্তকালেই দেখতে পাই। সুন্দর এ-ই পাখিটির নাম বৌরি পাখি। আমাদের বাংলার মানুষ কেউ-কেউ বসন্ত বৌরি নামেও সম্বোধন করে।
  বসন্তকালে আমাদের বাংলায় বড় পাখির তুলনায় বিভিন্ন ধরনের রঙবেরঙের ছোটো ছোটো পাখিদের ভীড় জমে বেশী।
এবার আসি বসন্তকালীন রংচঙে ফুলের কথায়। বসন্তকালে গাছে-গাছে বিভিন্ন রংচঙে ফুলের মাঝে মনে পড়ে যায়, শিমুল ফুলের কথা। বসন্তকালের এই ফুলটির সাথেই বাংলার মানুষ বেশী পরিচিত।
আবহমান বসন্ত তার রূপ জৌলুশ নিয়ে দশ মাস পর পর প্রতি বছর দুই মাসের অতিথি হয়ে এসে, আমাদের বাংলাকে নব যৌবন রূপে পুনর্জীবন করে তোলে। রঙে রঙে ভরে ওঠে সারা বাংলা।
আজ বসন্ত।
পাখি গাইবেই, ফুল ফুটবেই।
তরঙ্গে তরঙ্গে সুরভিত গুঞ্জরিত।
রঙ্গশালা বঙ্গ আমার এলোরে এলো বসন্ত।।
দীর্ঘদিনের অপেক্ষা ভেঙে উন্মুক্ত করে দিল বাংলা তার বদ্ধ দুয়ার দখিনা বাতাসের সম্মুখে। এক গুচ্ছ রঙবেরঙের ফুলের সাজি আর ছোটো ছোটো রঙবেরঙের পাখিদের নাচ-গান নিয়ে বসন্তের পদার্পণ। গাছের বাহু জড়িয়ে ধরে নানান রঙে ফুলেদের হাসি আর পাখিদের গানে-গানে বাংলা আজ উল্লাসিত। বুড়িয়ে যাওয়া বড়-বড় গাছগুলো, যেমন কৃষ্ণচূড়া, রাধাচূড়া, পলাশ, নাগেশ্বর, নাগকেশর, মহুয়া, বেল আরও কতকিছু। এরা সবাই আজ বসন্তের ছোঁয়া পেয়ে পুরাতন শুকনো পাতার পরিধান ছেড়ে আজ ফুলে ফুলে সেজে উঠেছে নতুন সাজে।  এখানে সেখানে, আদাড়ে বাদাড়ে অবহেলায় পড়ে থাকা নাম না জানা ছোটো ছোটো জংলী গাছগুলো দীর্ঘদিন অপেক্ষার পর, তারা ও আজ ফুলে ফুলে নতুন সাজে সেজে উঠেছে।  গাছে গাছে পাখিদের কলকাকলি, ফুলের রেণু গায়ে মেখে প্রজাপতিদের বক্র-পথে বিচরণ,  আম বনের মৌগন্ধে মৌমাছিদের গুঞ্জরন; আর ফুলে ফুলে গুঞ্জন পাখির চুম্বন। সোনা বউ পাখির টেরা চোখের চাহনিতে বুলি আওড়ানো বউ কথা কও, বউ কথা কও। 
যেদিকে চাই আকাশ বাতাস সুরভিত, নজর কাড়া রঙ-জৌলুশ, পাখিদের কলতান, সব মিলিয়ে সারা বাংলা আজ বসন্তের তালে তাল মিলিয়ে বিচিত্র বর্ণসমন্বিত হয়ে উঠেছে।
আহারে, আর কি চায় আমরা!
কিসের প্রয়োজন সাজানো ফুলের বাগান,
কি প্রয়োজন পোষ মানানো পখির গান।।
চাইনা গো আর বোতল বন্দী ঘরের সুঘ্রাণ।
সবার সেরা সব পেয়েছি স্রস্টার শ্রেষ্ঠ দান।।

Sunday, 7 October 2018

দিবানিশি

দিবানিশি

আব্দুল মান্নান মল্লিক

শুভ্রা বিশাল ক্ষমতাশালী এক নারী, দৈব শক্তির অধিকারীনি ও তেজস্বীনি। তিনি কখনো কঠোর আবার কখনো মমতাময়ী। সঙ্কটকালে মানুষের পাশে এসে বিপদমুক্ত করেন। তাই তিনি সবার কাছে খুব প্রিয় হয়ে উঠেছেন। শুভ্রার প্রতিভা তীব্র গতিতে প্রভাব বিস্তার করে প্রতিটা মানুষের মনে। মানুষ তাদের সুখ দুঃখের দায়ভার সমস্ত মমতাময়ী শুভ্রার হাতে ন্যস্ত করেন।
তাই বছরে একবার ফুল চন্দন নানান উপকরণে জাঁকজমক করে সমাদরে শুভ্রাকে আহ্বান করেন। সেইসময় যে যার মতো অভাব অভিযোগ মমতাময়ী শুভ্রার কাছে পেশ করেন।
শুভ্রা প্রতিটা মানুষের কাছে জনপ্রিয় হয়ে উঠতে দেখে অত্যাচারী শ্যাম বিচলিত হয়ে উঠলো, কিছুতেই এটা বরদাস্ত পারছেনা।
শ্যাম মনে মনে ফন্দি আঁটে, ছলে বলে কৌশলে শুভ্রাকে দূর্বল করে নিজেই বিশাল শক্তির অধিকারী হয়ে ত্রিভুবনের অধিপতি হবে। তাই সে শুভ্রাকে একা করে দিতেই শুভ্রা-র প্রিয়জনদের উপর দিনের পর দিন অত্যাচার করে এবং পশুর ন্যায় বল প্রয়োগ করে,এবং কারও প্রাণ নাশ করতেও দ্বিধান্বিত হয়না।
শ্যামের উদ্দেশ্য শুভ্রা-র অনুগতের প্রত্যেকেই ভয় পেয়ে ফিরে আসুক শ্যামের অনুগতে।
আসলেই তো শ্যাম পশুর আচরণে সৃষ্ট। তাই হিংস্র জন্তু জানোয়ার নিয়েই শ্যাম গোষ্ঠী।
ইচ্ছা করলে শুভ্রা স্বল্প ইশারাতেই শ্যাম গোষ্ঠীর প্রত্যেককে নিজের বসে আনতে পারেন , এমনকি দৃষ্টি শক্তি প্রয়োগ করে নিমেষেই ভস্ম করে দিতেও পারেন। শুভ্রার আগমনি বার্তা ছিল শ্যামের মহা বিষমকাল।
শুভ্রার ওজ্বল্যতা শক্তি ছিল শ্যাম গোষ্ঠীর সর্বনাশা।
তাই শুভ্রার মুখোমুখি দাঁড়াতে না পেরে নিরীহ ভক্তদের উপর হিংসার বল প্রয়োগ করে চলেছে।
শুভ্রার আগমনকালে শ্যাম ভয়ে নিজেকে নিরাপদ রাখতে সকলের অগোচরে অজানা ঠিকানায় আত্মগোপন করে। গোষ্ঠীর বাকী সকলের এইভাবে আত্মগোপন করার কৌশল জানা ছিলনা, তাই তারা ঝোপঝাড়  বা নোংরা ডোবা, খালে লুকিয়ে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতো।
শুভ্রা-র অবর্তমানে শ্যাম রাজশাসন চালিয়ে যায়।  রাস্তাঘাটে গ্রাম-গঞ্জে শ্যাম গোষ্ঠী বলশালী বিকট চেহারা নিয়ে কর্কশ কন্ঠে বিকট চিৎকার চেঁচামেচি করে শুভ্রার ভক্তদের ভয় দেখিয়ে স্বপক্ষে টানতে চায়। শ্যাম গোষ্ঠী অত্যাচারের সীমা অতিক্রম করতে চলেছে। শুভ্রার ভক্তগণ অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছে।
আর নয়, নানান উপকরণে আবারও করুণাময়ী শুভ্রাকে আহ্বান করেছেন তার ভক্তগণ। শুভ্রা এই আহ্বানে সাড়া দিয়ে জানিয়েছেন, যে আগামী কয়েকদিনের মধ্যেই আসছেন। আরও জানিয়েছেন তিনি, এবারের যুদ্ধ হবে এমনই, বিনা রক্তাক্তে শ্যাম গোষ্ঠীর সবাইকে বন্দী করে তাদের অন্তরের অন্ধকারকে বোধ করবেন নিজের ঔজ্জ্বল্য প্রভায়।


Sunday, 5 August 2018

ভুল যখন ফুল হয়ে ফুটে

ভুল যখন ফুল হয়ে ফুটে

আব্দুল মান্নান মল্লিক

এক সঙ্গে খেলাধুলা থেকে শুরু করে, এক ক্লাসে একই স্কুলে পড়াশুনা করে আমরা বড় হয়েছি।
আমাদের বাড়ি থেকে মাত্র কয়েকটা বাড়ি ছেড়ে একই পাড়াতে ওদের বাড়ি।
ছেলেবেলা থেকেই টিঙ্কুর খুটিনাটি এটাসেটা লিখালিখির অভ্যাস। দু-চার লাইনের কবিতা লিখে মাঝেমধ্যে আমাদেরকে দেখিয়ে বলতো, কেমন হয়েছে? আমরা সবান্ধবে না দেখেই টিঙ্কুকে খুশি করতেই বলতাম বা বেশ লিখেছিস। তাতেই টিঙ্কু খুব খুশি হতো। তখনো হয়তো সে মনে মনে  ভাবতো একদিন বড় কবি হবে।
আমরাও এতটা বুঝতে পারিনি, যে আমাদের উৎসাহই তার কবিতা লিখার একমাত্র সম্বল।
এমনিভাবেই দিন গড়িয়ে চলে।
হঠাৎ একদিন টিঙ্কু  আমাদের বাড়িতে এসে মায়ের কাছে আমার খোঁজ করছে। টিঙ্কুর কণ্ঠস্বর বুঝতে পেরে ঘর থেকে ভেরিয়ে দেখি, তখনও টিঙ্কু হাঁপাচ্ছে। টিঙ্কুকে জিজ্ঞেস করি তোর হাতে ওটা কিরে, টিঙ্কু বলে সেটাই তো, চল চল ঘরে চল সব বলছি। মা জিজ্ঞেস করে আরে, অমন করে হাঁপাচ্ছিস, কি হল বলবি তো? টিঙ্কু মায়ের কথায় কর্ণপাত না করে সোজা আমার ঘরে। কি এমন হল ভেবে ততক্ষণে মা ও পিছন পিছন ঢুকে পড়েছে।
টিঙ্কু যেন একেবারে আনন্দে আত্মহারা। এ-কোণ থেকে ওই কোণ, কখনো আমার শোয়ার খাটে, আবার উঠে পড়ে। এত বড় ঘরটাতেও যেন টিঙ্কুর জায়গা হয়না। টিঙ্কুকে ধরে খাটের উপর বসিয়ে বল্লাম ব্যাপার কি বলবি তো?
এবার একটু শান্ত হয়ে টিঙ্কু আমার হাতে বইখানা দিয়ে বললো, এই দেখ ম্যাগাজিনে আমার একটি কবিতা বেরিয়েছে।
আমি ধীরেসুস্থে বইটি খুলতে ওর আর তর সয়না। আমার হাত থেকে কেড়ে নিয়ে বলে, দাঁড়া আমি বার করে দিচ্ছি , বলে বইটি হাঁটকে চলেছে তো চলেছেই। চোখে পড়ামাত্র আমাকে দেখিয়ে বলল, এই দেখ্, বড়বড় অক্ষরে লেখা আমার নাম। পড়ে দেখনা কেমন হয়েছে? কাকি-মা আপনিও দেখেন। আমি আর মা দেখতে থাকি।
মা টিঙ্কুকে প্রাণভরে আশীর্বাদ করে সংসার কাজে যোগ দিল।
সম্পূর্ণ পড়ে সত্যিই খুব ভালো লাগলো।
আশ্চর্য! টিঙ্কু যে এত সুন্দর কবিতা লিখবে ভাবতেও পারিনি।
কবিতার নাম শ্রেষ্ঠ বাঙালী।
টিঙ্কুকে জিজ্ঞেস করলাম, তোর এত সুন্দর কবিতা দেখে কাকা, কাকি-মা কি বললেন?
জবাবে টিঙ্কু বললো, বইটি হাতে পাওয়ামাত্র ছুটে এলাম তোর কাছে , চল এবার আমাদের বাড়িতে সবাইকে দেখাবো।
মনে মনে খুব লজ্জা পেলাম, আগের দিনের কথা ভেবে। ভাবতে থাকি, সবার আগে টিঙ্কু আজ চিত্তচাঞ্চল্যে ছুটে এসেছে বন্ধুর কাছে। আজ বুঝতে পারছি, বন্ধুত্ব কাকে বলে। সেটা চোখে আঙুল দিয়ে টিঙ্কুই দেখিয়ে দিল।
সবান্ধবে টিঙ্কুকে এতদিন যতটুকু মিথ্যা উৎসাহ দিয়েছি, সেটাকেই সত্য ভেবে সে পথ চলতে শুরু করে। মিথ্যা উৎসাহকে অবলম্বন করে আজ টিঙ্কু একজন বেশ বড় মাপের কবি।

যদিও সেই দিনটি friendship day হিসাবে ছিলনা।

বিশেষ দ্রষ্টব্য ( লিখাটি সম্পূর্ণ কাল্পনিক। কারও নামের সঙ্গে নাম মিললে বাস্তবকে নিয়ে কেউ টানাটানি করবেন না। )


Tuesday, 5 December 2017

√ ভূত গড়ির ভূত

ভূত গড়ির ভূত

আব্দুল মান্নান মল্লিক

বড় একটি মাঠ পেরিয়ে ওপারে কাজি পাড়া, বৈরি পোতা , লকেশগঞ্জ, হাতিমারা, এমনি দশ-বারটা গ্রাম নিয়ে একটি এলাকা।
কালুর বাড়ি এপারেই, লখিমপুর গ্রামে।
অভাবের সংসার। ওপারে গ্রামে গ্রামে বার ভাজা বিক্রি করে সে কোনোরকমে দিনপাত করত।
দিনটা ছিল পোষ মাসের শেষ শনিবার। কালু প্রতিদিনের ন্যায় আজও গেছে ওপারের গ্রামগুলিতে বার ভাজা বিক্রি করতে।
আজ কিভাবে যে কালুর সময় বয়ে গেল, কালু কিছুই বুঝতে পারল না।
প্রতিদিন মাথার উপর সূর্য উঠতে না উঠতেই কালুর বার ভাজা সব বিক্রি হয়ে যায়।
আজ সূর্য মাথা ছাড়িয়ে অনেকটা গড়ে গেছে, তবুও বার ভাজা অনেকটা রয়ে গেছে।
কালু ভীষণ চিন্তায় পড়লো। এত বড় মাঠ পেরিয়ে যেতে হবে তাকে। তাছাড়া যেখানে ভূতের আপাদানি তার পাশের রাস্তা ধরেই যেতে হবে আমাদের গ্রাম।
মাঠটিকে সবাই খাড়ির মাঠ বলেই ডাকে।
মাঠের চারিপাশের গ্রামগুলি ও দূরে-দূরে। এখানে কেউ বিপদে পড়ে চিৎকার চেঁচামিচি করলেও, আশপাশ গ্রামের কেউ শুনতে পাবেনা , যে ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে।
মাঠের মাঝে রাস্তার কাছাকাছি পানাতে ভরা একটি ডোবা আছে। ডোবাটির চার পাড়ে শেওড়া, কোথাও কোথাও দু-একটা কেওড়া গাছ, আর মাটি ছুঁয়ে আগাছায় ভরা। পাড়ের উপর ঈশান কোণে, ছোটো-বড় মিলে পাশা-পাশি দু-চারটে বেশ বড়-বড় তেঁতুল গাছ ।  দেখলেই বুঝা যায় জায়গাটি সুবিধা না, ভূতুড়ে। ভূতের ভয়ে ওখানে কোনো মানুষই যেতে চাইনা । অগত্যে বিশেষ প্রয়োজনে হয়ত কেউ যায়। তাও আবার দু-চার জন সঙ্গে করে। তাই বুঝি আশ-পাশ গ্রামের লোকেরা ডোবাটির নাম দিয়েছে ভূতগড়ি।
এমনিতে কালু ছিল প্রচণ্ড সাহসী। হলে হবে কি? ভূতের নাম শুনলে কে না ভয় পাই ?
যতই সাতপাঁচ ভাবতে থাকে , ততই ভয় বেড়ে যায় কালুর।
অগত্যে কি আর করবে, বাড়ি তো ফিরতেই হবে।
না আর কাল বিলম্ব করে লাভ নাই, এখনো হাতে সময় আছে, সন্ধের আগে বাড়ি পোঁছাতেই হবে। এই বলে কালু টানা টানা পা ফেলে পথ হাঁটতে শুরু করে, আবার মাঝে-মাঝে দৌড়ে চলে।
এত দৌড়েও পথ যেন ফুরাতে চায়না। পশ্চিমে ঢলে পড়া সূর্যটা ও যেন কালুর সাথে পাল্লা দিয়ে চলেছে।
ঠিক তাই, কথাই বলেনা যেখানে ভূতের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়। এত চেষ্টার পরেও, কালুর ঠিক তাই ঘটলো। ভূতগড়ির সোজাসুজি রাস্তায় পৌঁছানোর আগেই সূর্য তার নিজের আসনে বসে পড়েছে।
নেমে আসলো আবছা অন্ধকার।
ভয়ে কালুর পথ চলা স্তব্ধ প্রায়। ভাবছে এই হয়তো ভূতেরা এসে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে ওদের আকড়াতে,তারপর সবাই মিলে আমাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে |
এই কথা ভাবতে ভাবতে কালুর হাত পা ভয়ে অসাড় হয়ে আসছে ।
একি! কালু দেখল, বিশাল আকারের ছায়ার মতো কি যেন একটা ভেসে ওর দিকেই এগিয়ে আসছে। কাছে আসতেই অস্পষ্টে দেখা যায় একটি ছায়া ছায়া তেঁতুল গাছ । আর গাছের ডালে-ডালে জনা বিশেক ছায়ামূর্তি। তেঁতুল গাছটি কালুর সামনে এসে দাঁড়িয়ে যেতেই, কালু ভীষণ ভয় পেয়ে পিছন ফিরে সোজা দৌড় দিল। চেনা-চেনা গলায় কে যেন পাশ থেকে বললো, এই কালু, অমন করে ডৌড়াচ্ছিস কেনরে? কালু ভয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। কাছে আসতেই দেখে, কালুরই বন্ধু নন্দ। কালু দম চেড়ে জিজ্ঞেস করে তুই এখানে কি করছিস? আগে তুই বল, অমন করে দৌড়াচ্ছিলি কেন।
কালু হাঁপ ছেড়ে বলে, ভাইরে! সেকথা আর বলিস না ( বলে কালু তার সমস্ত ঘটনা নন্দকে বললো।) সবকিছু শুনার পর নন্দ বলে, তাহলে তোর আমার একই হাল ? আমি বিশেষ একটা প্রয়োজনে বৈরি পোতা গেছিলাম। ফিরে আসতেই এখানে সন্ধ্যা হয়ে গেল, অমনি ভিতরে ঢুকে গেল ভূতের ভয়। শুনেছি ভূতগড়িতে নাকি ভূত থাকে, তাই না পারছি এগিয়ে যেতে, না পারছি পিছিয়ে আসতে। যাক্, তোকে যখন সঙ্গে পেয়েছি, আর ভয় কিসের।
আয় ত দেখি আমার সঙ্গে । তুই পিছন পিছন আয়, আর আমি আগে আগে যায়। দেখি কোথায় শালার ভুত।
এইভাবে দুজনে চলতে লাগলো।
কেমন যেন একটা ধুঁ-ধুঁ গন্ধে কালুর শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো।
নন্দ জিজ্ঞেস করে, তোর খুব ভয় পাচ্ছে, না রে ?
অগত্যে ভয়কে আড়াল করে কালু বললো কৈ-কৈ না--তো!
কালুর খটকা বাঁধে, আমার মনের কথা নন্দ জানলো কি করে ? তাছাড়া ওর গায়ে এমন ধুঁ-ধুঁ গন্ধ এল কোত্থেকে? চলতে চলতে কালু মনে-মনে এই-ই ভাবতে থাকে।
হঠাৎ করে কালু দেখে চমকে উঠে, একি! নন্দর গায়ের জামাটা কোথায় গেল? গায়ে বড় বড় লোম! তবে কি এ নন্দ না? নিশ্চয় ওই দলেরই কেউ হবে। সর্বনাশ, আমি কি তাহলে ভূতের জালে জড়িয়ে পড়েছি? এখন উপায়! যেই ভাবা, অমনি ভুতটা বলে খবরদার, পালাতে চেষ্টা করিস না। পালাতে চেষ্টা করলে এখনি তোকে চিবিয়ে খাব, বলে কালুর দিকে মুখ ফিরাতেই কালু দেখতে পেল, কি বীভৎস চেহারা, সর্বাঙ্গে বড় বড় লোম, আর বেরিয়ে এল তার ঠোটের দুই কোণ থেকে দুটি বাঁকা বড় বড় ধারালো দাঁত। এই দেখে কালু জ্ঞান হারা হয়ে গেল।
কতক্ষণ যে সে অজ্ঞান অবস্থায় ছিল কিছুই বুঝতে পারলো না। জ্ঞান ফিরতেই কালু দেখতে পেল, একটা আবদ্ধ ঘরে একাই শুয়ে আছে। একেবারে নিস্তব্ধ। ভালো করে নজর দিয়ে দেখতে থাকে আর ভাবে, আমি কোথায় এসেছি? হাঁ, মনে হয় সেই, নন্দর রূপ ধরেছিল সেই বদমাইশ শয়তানটা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। ঘরটা ত দেখে মনে হয় অনেকদিনের পুরানো, ভূতুড়ে বাড়ি ।
কালু আস্তে আস্তে উঠে বসে, আর ভাবতে থাকে, না ভয় পেলে চলবে না। যেভাবেই হোক ভূতের খপ্পর থেকে নিজেকে বাঁচাতেই হবে।
কালু ঘর থেকে বেরোতে অনেক চেষ্টা করেও কোনো লাভ হল না। দরজা ধরে টানাটানি করেও কাজ হল না। সেটাও বাইরে থেকে বন্ধ করা। কালু পিছন দিকে একটি জানালা দেখতে পেল। তাতে সূক্ষ্ম একটি ছিদ্র আছে। কালু চক্ষু মেলে ছিদ্র দিয়ে দেখে একেবারে থ! অন্ধকার হলেও কষ্ট করে বুঝা যায়, সাট-সাট হয়ে দশ-বারটা বাচ্চা বাচ্চা ছেলে ঘুমন্ত অবস্থায় এবড়োখেবড়ো হয়ে পাশের ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে।
এই দৃশ্য দেখার পর কালু ভাবতে লাগলো, ওই শালারা হয়ত গ্রাম গঞ্জ থেকে উদর পূরণের জন্য ধরে এনেছে।
যেভাবেই হোক, নিজেকেও বাঁচাতে হবে, বাচ্ছেদেরকেও বাঁচাতে হবে। আমি ত ওদের হাতে ধরা পড়েই গেছি। তাছাড়া মরতে ত একদিন হবেই, আজ নইতো কাল। ওই শালার ভূতেরাও বুঝতে পারবে, কালুর গায়ে হাত দেওয়ার জ্বালাটা। একবার খপ্পর থেকে বেরোতে পারলে হয়।
ভাবতে ভাবতে দরজা খুলে ঢুকে পড়লো, সেই শয়তান ভূতটা, সঙ্গে আরও দুটো।
সর্বনাশ, শয়তানটা আবার আমার মনের কথা বুঝতে পারেনি তো? কালুর মনে বার বার একই প্রশ্ন জাগে। আবার ভাবতে থাকে না না, ভূতেরা একইসঙ্গে চতুর্দিক ভাবতে পারেনা। ওরা ত ওদেরকে নিয়েই ব্যস্ত।
এমন সময় আর একটি ভূত এসে বললো, এই পেঙু, তোদেরকে সর্দার ডাকছে, আর সঙ্গে যে মানুষ এনেছিস ওটাকেও নিয়ে আয়, এই বলে চলে গেল।
সর্দারের কথা মত কালুকে নিয়ে গেল সেই ঘরে, যেখানে বাচ্চাগুলো ঘুমিয়ে ছিল।
কালু দেখে, এবড়োখেবড়ো হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে থাকা বাচ্চাগুলো সবাই এখন জেগে রয়েছে।
কালুকে দেখামাত্র একটি বাচ্চা চিনতে পেরে কাছে আসতে চেষ্টা করলে, কালু ইশারা দিতেই বাচ্চাটা চুপ হয়ে গেল।
আসলে বাচ্ছাটা ওদের পাশের বাড়ির। এই নিয়ে কত থানাপুলিশ হয়ে গেছে। আজও কোনো সার-উদ্ধার হয়নি তার।
লখিমপুর ও তার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে ছেলে হারানোর খবর প্রায় মাঝে-মধ্যে শুনতে পাওয়া যায়। অনেক খুঁজাখুঁজি করেও, আজ পর্যন্ত একটির ও সন্ধান মিলেনি।
এলাকার সবার ধারণা, কেউ হয়তো পাচার করছে। এর পিছনে বড় রকমের হাত আছে। তাই অচেনা পথচলতি বহু লোক সন্দেহের জালে পড়ে, এই এলাকার লোকের হাতে বেদম মারও খেয়েছে। আবার অচেনা কাউকে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে । তারাও কেউ আজ অবধি ছাড় পাইনি, জেলেই পচছে।
এবার বুঝি ওদের উদর পূরণ করতে কালু এসেছে।
ওদের নাঁকি সুরের কথাগুলো কালু সবটা না বুঝলেও আকার ইঙ্গিতে কিছুকিছু বুঝতে পারছে। সর্দারের ভাগে পড়লো আমার মাথা, কেউ বলছে আমার পা, আর একজন বলছে বাকি একটা পা আমার। আর একজন ছুটতে ছুটতে এসে বলে আমি মানুষের হাত খেতে খুব ভালোবাসি। একটি বৃদ্ধা ভূত বলে কি না,তোরা যে যা খাবি খাস, আমার জন্য কলিজাটা রাখিস যেন,হাঁ।
কালু জেন্ত থাকতেই তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে ভাগাভাগি চলছে।
এমন সময় ভূতের সর্দার বললো, তোরা শুধু বক্-বক্ করবি, না কিছু খাবি? খিদে পাইনি তোদের?
বাকি ভূতেরা বললো হাঁ-হাঁ, আমাদেরও খুব খিদে পেয়েছে।
পেঙু বলে, তাহলে আর দেরি কেন? মানুষটাকেই এবার খেয়ে ফেলি ?
সর্দার বললো, নারে না, ওকে এখন খাব না। এখন ছোটোখাটো কিছু খেলেই সবার টিফিন মতো হয়ে যাবে। ভালো করে স্নান-টান করে তারপর তৃপ্তির সাথে মানুষটাকে খাব।
সর্দারের কথায় ভূতেরা সবাই সাঁই দিল।
সর্দারের কথামত পেঙু সবচেয়ে ছোটো বাচ্চাকে ধরে আনতেই, বাচ্চাটা কান্না করে আর বলে, আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মায়ের কাছে যাব, মা বাড়িতে আমার জন্য খুব কান্নাকাটি করছে।
নিষ্ঠুর প্রাণ ভুতের। কারও কান্নায় ওদের মন গলে না, বরং কানে ব্যথা লাগে। তাই বাচ্চাটার কান্না পেঙু সহ্য করতে না পেরে, ঘাড় মুটকে দিয়ে চিরদিনের মত চুপ করিয়ে দিল।
তারপর বীভৎস চেহারা ধারণ করে ভূতেরা সব বাচ্চাটার শরীরে বিষাক্ত দাঁত ফুটিয়ে বাচ্চাটার সমস্ত রক্ত শোষণ করে নিল।
কালুর সম্মুখে এই দৃশ্য দেখে কালু খুব কষ্ট পেল। রাগে কালুর ইচ্ছা হচ্ছিল ওদের সঙ্গে মারপিট আরম্ভ করে দিই। পরক্ষণেই ভাবলো না, তাতে কোনো লাভ হবে না, উলটে নিজেকেও বাঁচাতে পারব না, বাকি বাচ্চাদেরকে ও না।
অনেক কষ্টে অশ্রু সংবরণ করে চুপচাপ বসে রয়েছে কালু।
শয়তান ভূতেরা বাচ্চাটার রক্ত শোষণের পরে এবার ছিঁড়ে ছিঁড়ে মাংস খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এদের নোংরামি ব্যাপার-স্যাপার দেখে কালুর রাগ একেবারে চরমে উঠে গেছে।
কালুর বুঝতে আর বাকি রইলো না। যত বাচ্চাদের অনিষ্টের কারণ এখানকার ভূতেরাই।
কালু মনে মনে বিভিন্ন রকম ফন্দি আঁটতে থাকে, সবই কেটে যাচ্ছে,  কোনোটাই যেন কাজে আসছে না।
হঠাৎ করে কালুর মনে পড়ে গেল বড়দের কথা।
ভূতেরা নাকি আগুন দেখে খুব ভয় পায়।
কালু এবার অনেকটা আশ্বাস পেয়ে ভাবতে থাকে, দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা।
কালুর মনে পড়ে গেল, তার ঝাঁপির মধ্যে বিড়ি আর দিয়াশলাই আছে।
কালু মনে মনে ফন্দি বেঁধে ভূতের সর্দারকে বললো তোমরা মাংস খাওয়ার কৌশল কি, সেটা ও জান না?
ভূতের সর্দার বললো, কেন? মাংস আবার কিভাবে খেতে হয়। আমরা ত গোটা মানুষ ধারালো দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে-ছিঁড়ে খায়।
কালু বললো, তাইতো বলি, ভূত না অদ্ভুত।
আমরা মাংস খাই বার ভাজা দিয়ে।
সর্দার বললো, এখন আমরা বার ভাজা কোথায় পাবো?
কালু বললো এইতো আমার ঝাঁপিতেই আছে।
ভূতেরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে নাচতে লাগলো, বা-বা-- কি মজা, আজ আমরা বার ভাজা দিয়ে মানুষের মাংস খাবো।
সবাই কালুকে ছেঁকে ধরেছে, দাওনা গো তোমার বার ভাজা, ওই ছেলেটাকে এখনি আমরা খাবো তোমার বার ভাজা দিয়ে।
কালু বললো তোমরা সবাই আমার কাছে এসো, আমার ঝাঁপি থেকে বার ভাজা বার করে সবার হাতে হাতে দিবো।
কালুর কথামত সবাই কালুকে ঘিরে বসলো।
কালু কাপড়ে বাঁধা মোড়ক খুলে ঝাঁপির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কি যেন খুজতে লাগলো।
কালু দিয়াশলাইটা হাতে পাওয়া মাত্র ঝাঁপির ভিতর ফড়াম করে আগুন জ্বালিয়ে দিল।
আগুন দেখামাত্র ভুতেরা ভয়ে দূরে সরে গেল, দাউদাউ করে ঝাঁপি সহ মোড়ক পুড়তে থাকে।
কালু বাচ্চাদেরকে কাছে ডাকতে বাচ্চারা ভিড়ে গেল।
কালু ঠাট্টা করে আর ভূতদেরকে বলে, আয় বার ভাজা খাবি না?
ভূতেরা রাগের চোটে দূর থেকে দাঁত খিটিমিটি করে আর বলে বেইমান, তোর ঘাড় মুটকে রক্ত খাবো।
কালু ভূতের কথায় কর্ণপাত না করে শুধু ভাবতে থাকে, বদমাইশ ভূতেরা এইভাবে কতশত বাচ্চাদের জীবন নষ্ট করেছে, তার কোনো হিসাব নাই।
সেই সব বাচ্চাদের জামা কাপড়ের একটা গাদা ছিল। কালুর কথামত যে যতটা পারলো, ওই গাদা থেকে জামা কাপড় নিয়ে, একটা একটা আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে সবাই ভূতের বাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। যেসব ভূতেরা বাইরে কালুদের ধরার অপেক্ষায় ছিল, প্রত্যেকের হাতে মশালের মতো আগুন দেখে তারা একটা একটা করে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
পিছন ফিরে কালু দেখে ঘণ পাতাই ঢাকা শেওড়া গাছের গোড়ায় সুড়ঙ্গ পথে আগুন ছিটকিয়ে বেরিয়ে আসছে।
আগুন দেখে কালু মনে-মনে ভাবতে থাকে, এবার ভূতুড়ে বাড়ি পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে।
এইভাবে কালু সকলকে উদ্ধার করে গ্রামে নিয়ে আসে। কালুকে গ্রামের লোকেরা খুব বাহবা দিল।
আশপাশ গ্রামেও কালুর এই দক্ষতার ঘটনা প্রচার হয়ে গেল।
কালুকে বাহবা দিয়ে যে যার ছেলে নিজ নিজ বাড়ি নিয়ে গেল।
কালুর এই দক্ষতার জন্য নিজের গ্রাম ছাড়াও আশপাশ গ্রাম থেকেও বকশিশ হিসাবে প্রচুর আর্থিক সাহায্য পেয়ে কালু দাঁড়িয়ে গেল।
হারানো ছেলে খুজে বার করতে থানার পুলিশ পর্যন্ত নাকাল হয়েছে। বহু চেষ্টা করেও পুলিশ কোনো সার উদ্ধার করতে পারেনি। কালু একাই সেটা করে সবাইকে দেখিয়ে দিল।
আজও কালুর চোখের সামনে ভেসে বেড়াই সেই বাচ্চাটার দৃশ্য, আর কানে বাজে কান্না, আমাকে ছেড়ে দাও, মায়ের কাছে যাবো!

Wednesday, 22 November 2017

√ ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক

ভেঙে যাওয়া সম্পর্ক

আব্দুল মান্নান মল্লিক

মাত্র পঁচিশ দিনের বাচ্চা রেখে মা পৃথিবী ছেড়ে চলে যায়। বাচ্চাটাকে দেখার মতো পৃথিবীতে তার আপন বলতে আর কেউ ছিলনা। কোথাও বসা মাচার তলে, নইত কোনো গাছতলে কখনো বা পথের ধারে কারও বারান্দায় শুয়ে রাত কাটাত।
তবুও তার এতটুকু শান্তি ছিলনা। চোখে পড়লেই সবাই তাকে দূর-দূর করে তাড়িয়ে দিতো।
সেদিন বিকেলে বন্ধুদের সাথে আড্ডা দিতে-দিতে বাড়ি ফিরতে অন্ধকার হয়ে গেছে। বাড়ি ঢুকতেই বাচ্চাটা ছুটতে ছুটতে এসে আমার পা চাঁটতে লাগলো। কোথায় ছিল কে জানে? যতই আলতো পায়ে ঠেলে সরিয়ে দিই, তবুও আমাকে ছাড়তে চাইনা। যেন কতদিনের চেনা।
বারবার এমনভাবে দেখে আমারও মনটা খুব দুর্বল হয়ে গেল।
হেরে গেলাম এই অল্প বয়স্ক বাচ্ছাটার কাছে।
ওর উপর আমার খুব মায়া পড়ে গেল। ওকে বুকে তুলে চুমা দিতে-দিতে বাড়ি ঢুকতেই বাবা বলে, ওটা কি হবে?
আমি বললাম পুষব।
ঠিক আছে, তোর যখন এতই শখ, তো পুষনা। এই বলে বাবা হাসতে হাসতে বারান্দায় উঠে।
তখনই বোতলে দুধ ভরে ওকে খাওয়াইতে লাগলাম। খাওয়া দেখে মনে হল, যেন সাত সাগরের জল একাই খেয়ে ফেলবে। ক্রমে-ক্রমে দু'দিনের মধ্যেই সাভাবিক হয়ে গেল।
গায়ের রং ছিল সম্পূর্ণ সাদা, তাই আদর করে নাম রাখা হল ধবলা।
ধবলা দিনে-দিনে যত বড় হতে থাকে, মায়াও যেন বাড়তে থাকে। কোনো আত্মীয় পরিজনের সাথে কথা বললেও ওর খুব কষ্ট হয়। ও ঘেউঘেউ করে বুঝাতে চায় আমি যেন ওকে নিয়েই ব্যস্ত থাকি। আমার গায়ে কেউ হাত দিয়ে কথা বলুক, সেটাও কিছুতেই সহ্য করতে পারে না।
ধবলাকে ছেড়ে আমার বাইরে কোথাও যাওয়া বেশ কঠিন হয়ে পড়লো। কোথাও গেলে, ওর আড়ালে আমাকে যেতে হয়।
সব সময় ধবলা যেন আমাকেই খুজে বেড়ায়।
একদণ্ড চোখের আড়াল হলেই বাড়িতে ঘেউঘেউ করে চিৎকার চেঁচামেচি শুরু করে।
ও যেন ভাবে, পাছে আমার আপদ বিপদ না ঘটে, সঙ্গে থাকলে হয়ত ধবলা উদ্ধার করবে। বাড়ির সবার কাপড় ধরে টানাটানি করে, ওর ইচ্ছা, কেউ যেন ওকে আমার কাছে নিয়ে যায়।
যত দিন যায় ধবলা ও ধীরে-ধীরে আমার খুব প্রিয় বন্ধু হয়ে উঠলো।
ধবলা এখন বড় হয়েছে। আমাদের সম্পর্কটা এমন ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠলো, কুকুরের কথা ভুলেই গেছি। ও যেন আমার খুব প্রিয়জন।
এইভাবে চলতে চলতে একদিন হঠাৎ করে ভিন পাড়ার অন্য একটি কুকুর আমার বাড়িতে ঢুকে পড়েছে। ধবলা তাকে কিছুতেই সহ্য করতে না পেরে, ঘেউঘেউ করে ছুটে গিয়ে মারামারি কামড়াকামড়ি আরম্ভ করে দিল। ভিন পাড়ার কুকুরটি পালাতে চেষ্টা করে, কিন্তু কিছুতেই ছাড়তে চায়না। আমি অনেক চেষ্টা করেও যখন ছাড়াতে পারছিনা রাগের মাথায় ধবলাকে মেরেছিলাম। তারপর ধবলা শান্ত হয়ে গেল। ভিন পাড়ার কুকুরটি ও চলে গেল।
ধবলাকে আমি কাছে ডাকতে আর কোনো সাড়া দেয়না। চুপ করে বসে রইলো। চক্ষু বেয়ে টসটস করে জল পড়তে লাগল। বুঝতে পেরেছি, যাকে আমি এতদিন শুধু আদর করেই এসেছি, আজ হঠাৎ আমার স্বভাবের এই পরিবর্তন দেখে, ধবলা খুব দুঃখ পেয়েছে।
ধবলা সারা বাড়িটা একবার ভালো করে দেখে নিয়ে ধীরে ধীরে উঠে বাড়ির বাইরে পা ফেলে। আমি তার গলা ধরে বাড়ি ফিরিয়ে আনতে অনেক চেষ্টা করেও বিফল হলাম। অবশেষে আমি বাড়ি ফিরে বারান্দায় বসে গালে হাত দিয়ে ভাবছি, ওর দুঃখ ভাঙলে বাড়িতে আবার ফিরে আসবে।
বেশ কিছুক্ষণ পর দেখলাম আসছে না, বাইরে বেরিয়ে দেখি, তার জায়গায় সে আর নাই।
অনেক খুঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পেলামনা।
আজ প্রায় তিন মাস কেটে গেল, তবুও বিশ্বাসে পথ চেয়ে বসে আছি ধবলা একদিন না একদিন ফিরে আসবে।

Sunday, 29 October 2017

আত্মপরতা

আত্মপরতা

আব্দুল মান্নান মল্লিক

যদি সমস্ত জীবই নিস্বার্থে মানুষের কাজে আসে,
মানুষ কি কোনো একটি জীবেরও নিস্বার্থে কাজে এসেছে?