ভূত গড়ির ভূত
আব্দুল মান্নান মল্লিক
বড় একটি মাঠ পেরিয়ে ওপারে কাজি পাড়া, বৈরি পোতা , লকেশগঞ্জ, হাতিমারা, এমনি দশ-বারটা গ্রাম নিয়ে একটি এলাকা।
কালুর বাড়ি এপারেই, লখিমপুর গ্রামে।
অভাবের সংসার। ওপারে গ্রামে গ্রামে বার ভাজা বিক্রি করে সে কোনোরকমে দিনপাত করত।
দিনটা ছিল পোষ মাসের শেষ শনিবার। কালু প্রতিদিনের ন্যায় আজও গেছে ওপারের গ্রামগুলিতে বার ভাজা বিক্রি করতে।
আজ কিভাবে যে কালুর সময় বয়ে গেল, কালু কিছুই বুঝতে পারল না।
প্রতিদিন মাথার উপর সূর্য উঠতে না উঠতেই কালুর বার ভাজা সব বিক্রি হয়ে যায়।
আজ সূর্য মাথা ছাড়িয়ে অনেকটা গড়ে গেছে, তবুও বার ভাজা অনেকটা রয়ে গেছে।
কালু ভীষণ চিন্তায় পড়লো। এত বড় মাঠ পেরিয়ে যেতে হবে তাকে। তাছাড়া যেখানে ভূতের আপাদানি তার পাশের রাস্তা ধরেই যেতে হবে আমাদের গ্রাম।
মাঠটিকে সবাই খাড়ির মাঠ বলেই ডাকে।
মাঠের চারিপাশের গ্রামগুলি ও দূরে-দূরে। এখানে কেউ বিপদে পড়ে চিৎকার চেঁচামিচি করলেও, আশপাশ গ্রামের কেউ শুনতে পাবেনা , যে ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে।
মাঠের মাঝে রাস্তার কাছাকাছি পানাতে ভরা একটি ডোবা আছে। ডোবাটির চার পাড়ে শেওড়া, কোথাও কোথাও দু-একটা কেওড়া গাছ, আর মাটি ছুঁয়ে আগাছায় ভরা। পাড়ের উপর ঈশান কোণে, ছোটো-বড় মিলে পাশা-পাশি দু-চারটে বেশ বড়-বড় তেঁতুল গাছ । দেখলেই বুঝা যায় জায়গাটি সুবিধা না, ভূতুড়ে। ভূতের ভয়ে ওখানে কোনো মানুষই যেতে চাইনা । অগত্যে বিশেষ প্রয়োজনে হয়ত কেউ যায়। তাও আবার দু-চার জন সঙ্গে করে। তাই বুঝি আশ-পাশ গ্রামের লোকেরা ডোবাটির নাম দিয়েছে ভূতগড়ি।
এমনিতে কালু ছিল প্রচণ্ড সাহসী। হলে হবে কি? ভূতের নাম শুনলে কে না ভয় পাই ?
যতই সাতপাঁচ ভাবতে থাকে , ততই ভয় বেড়ে যায় কালুর।
অগত্যে কি আর করবে, বাড়ি তো ফিরতেই হবে।
না আর কাল বিলম্ব করে লাভ নাই, এখনো হাতে সময় আছে, সন্ধের আগে বাড়ি পোঁছাতেই হবে। এই বলে কালু টানা টানা পা ফেলে পথ হাঁটতে শুরু করে, আবার মাঝে-মাঝে দৌড়ে চলে।
এত দৌড়েও পথ যেন ফুরাতে চায়না। পশ্চিমে ঢলে পড়া সূর্যটা ও যেন কালুর সাথে পাল্লা দিয়ে চলেছে।
ঠিক তাই, কথাই বলেনা যেখানে ভূতের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়। এত চেষ্টার পরেও, কালুর ঠিক তাই ঘটলো। ভূতগড়ির সোজাসুজি রাস্তায় পৌঁছানোর আগেই সূর্য তার নিজের আসনে বসে পড়েছে।
নেমে আসলো আবছা অন্ধকার।
ভয়ে কালুর পথ চলা স্তব্ধ প্রায়। ভাবছে এই হয়তো ভূতেরা এসে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে ওদের আকড়াতে,তারপর সবাই মিলে আমাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে |
এই কথা ভাবতে ভাবতে কালুর হাত পা ভয়ে অসাড় হয়ে আসছে ।
একি! কালু দেখল, বিশাল আকারের ছায়ার মতো কি যেন একটা ভেসে ওর দিকেই এগিয়ে আসছে। কাছে আসতেই অস্পষ্টে দেখা যায় একটি ছায়া ছায়া তেঁতুল গাছ । আর গাছের ডালে-ডালে জনা বিশেক ছায়ামূর্তি। তেঁতুল গাছটি কালুর সামনে এসে দাঁড়িয়ে যেতেই, কালু ভীষণ ভয় পেয়ে পিছন ফিরে সোজা দৌড় দিল। চেনা-চেনা গলায় কে যেন পাশ থেকে বললো, এই কালু, অমন করে ডৌড়াচ্ছিস কেনরে? কালু ভয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। কাছে আসতেই দেখে, কালুরই বন্ধু নন্দ। কালু দম চেড়ে জিজ্ঞেস করে তুই এখানে কি করছিস? আগে তুই বল, অমন করে দৌড়াচ্ছিলি কেন।
কালু হাঁপ ছেড়ে বলে, ভাইরে! সেকথা আর বলিস না ( বলে কালু তার সমস্ত ঘটনা নন্দকে বললো।) সবকিছু শুনার পর নন্দ বলে, তাহলে তোর আমার একই হাল ? আমি বিশেষ একটা প্রয়োজনে বৈরি পোতা গেছিলাম। ফিরে আসতেই এখানে সন্ধ্যা হয়ে গেল, অমনি ভিতরে ঢুকে গেল ভূতের ভয়। শুনেছি ভূতগড়িতে নাকি ভূত থাকে, তাই না পারছি এগিয়ে যেতে, না পারছি পিছিয়ে আসতে। যাক্, তোকে যখন সঙ্গে পেয়েছি, আর ভয় কিসের।
আয় ত দেখি আমার সঙ্গে । তুই পিছন পিছন আয়, আর আমি আগে আগে যায়। দেখি কোথায় শালার ভুত।
এইভাবে দুজনে চলতে লাগলো।
কেমন যেন একটা ধুঁ-ধুঁ গন্ধে কালুর শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো।
নন্দ জিজ্ঞেস করে, তোর খুব ভয় পাচ্ছে, না রে ?
অগত্যে ভয়কে আড়াল করে কালু বললো কৈ-কৈ না--তো!
কালুর খটকা বাঁধে, আমার মনের কথা নন্দ জানলো কি করে ? তাছাড়া ওর গায়ে এমন ধুঁ-ধুঁ গন্ধ এল কোত্থেকে? চলতে চলতে কালু মনে-মনে এই-ই ভাবতে থাকে।
হঠাৎ করে কালু দেখে চমকে উঠে, একি! নন্দর গায়ের জামাটা কোথায় গেল? গায়ে বড় বড় লোম! তবে কি এ নন্দ না? নিশ্চয় ওই দলেরই কেউ হবে। সর্বনাশ, আমি কি তাহলে ভূতের জালে জড়িয়ে পড়েছি? এখন উপায়! যেই ভাবা, অমনি ভুতটা বলে খবরদার, পালাতে চেষ্টা করিস না। পালাতে চেষ্টা করলে এখনি তোকে চিবিয়ে খাব, বলে কালুর দিকে মুখ ফিরাতেই কালু দেখতে পেল, কি বীভৎস চেহারা, সর্বাঙ্গে বড় বড় লোম, আর বেরিয়ে এল তার ঠোটের দুই কোণ থেকে দুটি বাঁকা বড় বড় ধারালো দাঁত। এই দেখে কালু জ্ঞান হারা হয়ে গেল।
কতক্ষণ যে সে অজ্ঞান অবস্থায় ছিল কিছুই বুঝতে পারলো না। জ্ঞান ফিরতেই কালু দেখতে পেল, একটা আবদ্ধ ঘরে একাই শুয়ে আছে। একেবারে নিস্তব্ধ। ভালো করে নজর দিয়ে দেখতে থাকে আর ভাবে, আমি কোথায় এসেছি? হাঁ, মনে হয় সেই, নন্দর রূপ ধরেছিল সেই বদমাইশ শয়তানটা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। ঘরটা ত দেখে মনে হয় অনেকদিনের পুরানো, ভূতুড়ে বাড়ি ।
কালু আস্তে আস্তে উঠে বসে, আর ভাবতে থাকে, না ভয় পেলে চলবে না। যেভাবেই হোক ভূতের খপ্পর থেকে নিজেকে বাঁচাতেই হবে।
কালু ঘর থেকে বেরোতে অনেক চেষ্টা করেও কোনো লাভ হল না। দরজা ধরে টানাটানি করেও কাজ হল না। সেটাও বাইরে থেকে বন্ধ করা। কালু পিছন দিকে একটি জানালা দেখতে পেল। তাতে সূক্ষ্ম একটি ছিদ্র আছে। কালু চক্ষু মেলে ছিদ্র দিয়ে দেখে একেবারে থ! অন্ধকার হলেও কষ্ট করে বুঝা যায়, সাট-সাট হয়ে দশ-বারটা বাচ্চা বাচ্চা ছেলে ঘুমন্ত অবস্থায় এবড়োখেবড়ো হয়ে পাশের ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে।
এই দৃশ্য দেখার পর কালু ভাবতে লাগলো, ওই শালারা হয়ত গ্রাম গঞ্জ থেকে উদর পূরণের জন্য ধরে এনেছে।
যেভাবেই হোক, নিজেকেও বাঁচাতে হবে, বাচ্ছেদেরকেও বাঁচাতে হবে। আমি ত ওদের হাতে ধরা পড়েই গেছি। তাছাড়া মরতে ত একদিন হবেই, আজ নইতো কাল। ওই শালার ভূতেরাও বুঝতে পারবে, কালুর গায়ে হাত দেওয়ার জ্বালাটা। একবার খপ্পর থেকে বেরোতে পারলে হয়।
ভাবতে ভাবতে দরজা খুলে ঢুকে পড়লো, সেই শয়তান ভূতটা, সঙ্গে আরও দুটো।
সর্বনাশ, শয়তানটা আবার আমার মনের কথা বুঝতে পারেনি তো? কালুর মনে বার বার একই প্রশ্ন জাগে। আবার ভাবতে থাকে না না, ভূতেরা একইসঙ্গে চতুর্দিক ভাবতে পারেনা। ওরা ত ওদেরকে নিয়েই ব্যস্ত।
এমন সময় আর একটি ভূত এসে বললো, এই পেঙু, তোদেরকে সর্দার ডাকছে, আর সঙ্গে যে মানুষ এনেছিস ওটাকেও নিয়ে আয়, এই বলে চলে গেল।
সর্দারের কথা মত কালুকে নিয়ে গেল সেই ঘরে, যেখানে বাচ্চাগুলো ঘুমিয়ে ছিল।
কালু দেখে, এবড়োখেবড়ো হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে থাকা বাচ্চাগুলো সবাই এখন জেগে রয়েছে।
কালুকে দেখামাত্র একটি বাচ্চা চিনতে পেরে কাছে আসতে চেষ্টা করলে, কালু ইশারা দিতেই বাচ্চাটা চুপ হয়ে গেল।
আসলে বাচ্ছাটা ওদের পাশের বাড়ির। এই নিয়ে কত থানাপুলিশ হয়ে গেছে। আজও কোনো সার-উদ্ধার হয়নি তার।
লখিমপুর ও তার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে ছেলে হারানোর খবর প্রায় মাঝে-মধ্যে শুনতে পাওয়া যায়। অনেক খুঁজাখুঁজি করেও, আজ পর্যন্ত একটির ও সন্ধান মিলেনি।
এলাকার সবার ধারণা, কেউ হয়তো পাচার করছে। এর পিছনে বড় রকমের হাত আছে। তাই অচেনা পথচলতি বহু লোক সন্দেহের জালে পড়ে, এই এলাকার লোকের হাতে বেদম মারও খেয়েছে। আবার অচেনা কাউকে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে । তারাও কেউ আজ অবধি ছাড় পাইনি, জেলেই পচছে।
এবার বুঝি ওদের উদর পূরণ করতে কালু এসেছে।
ওদের নাঁকি সুরের কথাগুলো কালু সবটা না বুঝলেও আকার ইঙ্গিতে কিছুকিছু বুঝতে পারছে। সর্দারের ভাগে পড়লো আমার মাথা, কেউ বলছে আমার পা, আর একজন বলছে বাকি একটা পা আমার। আর একজন ছুটতে ছুটতে এসে বলে আমি মানুষের হাত খেতে খুব ভালোবাসি। একটি বৃদ্ধা ভূত বলে কি না,তোরা যে যা খাবি খাস, আমার জন্য কলিজাটা রাখিস যেন,হাঁ।
কালু জেন্ত থাকতেই তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে ভাগাভাগি চলছে।
এমন সময় ভূতের সর্দার বললো, তোরা শুধু বক্-বক্ করবি, না কিছু খাবি? খিদে পাইনি তোদের?
বাকি ভূতেরা বললো হাঁ-হাঁ, আমাদেরও খুব খিদে পেয়েছে।
পেঙু বলে, তাহলে আর দেরি কেন? মানুষটাকেই এবার খেয়ে ফেলি ?
সর্দার বললো, নারে না, ওকে এখন খাব না। এখন ছোটোখাটো কিছু খেলেই সবার টিফিন মতো হয়ে যাবে। ভালো করে স্নান-টান করে তারপর তৃপ্তির সাথে মানুষটাকে খাব।
সর্দারের কথায় ভূতেরা সবাই সাঁই দিল।
সর্দারের কথামত পেঙু সবচেয়ে ছোটো বাচ্চাকে ধরে আনতেই, বাচ্চাটা কান্না করে আর বলে, আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মায়ের কাছে যাব, মা বাড়িতে আমার জন্য খুব কান্নাকাটি করছে।
নিষ্ঠুর প্রাণ ভুতের। কারও কান্নায় ওদের মন গলে না, বরং কানে ব্যথা লাগে। তাই বাচ্চাটার কান্না পেঙু সহ্য করতে না পেরে, ঘাড় মুটকে দিয়ে চিরদিনের মত চুপ করিয়ে দিল।
তারপর বীভৎস চেহারা ধারণ করে ভূতেরা সব বাচ্চাটার শরীরে বিষাক্ত দাঁত ফুটিয়ে বাচ্চাটার সমস্ত রক্ত শোষণ করে নিল।
কালুর সম্মুখে এই দৃশ্য দেখে কালু খুব কষ্ট পেল। রাগে কালুর ইচ্ছা হচ্ছিল ওদের সঙ্গে মারপিট আরম্ভ করে দিই। পরক্ষণেই ভাবলো না, তাতে কোনো লাভ হবে না, উলটে নিজেকেও বাঁচাতে পারব না, বাকি বাচ্চাদেরকে ও না।
অনেক কষ্টে অশ্রু সংবরণ করে চুপচাপ বসে রয়েছে কালু।
শয়তান ভূতেরা বাচ্চাটার রক্ত শোষণের পরে এবার ছিঁড়ে ছিঁড়ে মাংস খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এদের নোংরামি ব্যাপার-স্যাপার দেখে কালুর রাগ একেবারে চরমে উঠে গেছে।
কালুর বুঝতে আর বাকি রইলো না। যত বাচ্চাদের অনিষ্টের কারণ এখানকার ভূতেরাই।
কালু মনে মনে বিভিন্ন রকম ফন্দি আঁটতে থাকে, সবই কেটে যাচ্ছে, কোনোটাই যেন কাজে আসছে না।
হঠাৎ করে কালুর মনে পড়ে গেল বড়দের কথা।
ভূতেরা নাকি আগুন দেখে খুব ভয় পায়।
কালু এবার অনেকটা আশ্বাস পেয়ে ভাবতে থাকে, দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা।
কালুর মনে পড়ে গেল, তার ঝাঁপির মধ্যে বিড়ি আর দিয়াশলাই আছে।
কালু মনে মনে ফন্দি বেঁধে ভূতের সর্দারকে বললো তোমরা মাংস খাওয়ার কৌশল কি, সেটা ও জান না?
ভূতের সর্দার বললো, কেন? মাংস আবার কিভাবে খেতে হয়। আমরা ত গোটা মানুষ ধারালো দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে-ছিঁড়ে খায়।
কালু বললো, তাইতো বলি, ভূত না অদ্ভুত।
আমরা মাংস খাই বার ভাজা দিয়ে।
সর্দার বললো, এখন আমরা বার ভাজা কোথায় পাবো?
কালু বললো এইতো আমার ঝাঁপিতেই আছে।
ভূতেরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে নাচতে লাগলো, বা-বা-- কি মজা, আজ আমরা বার ভাজা দিয়ে মানুষের মাংস খাবো।
সবাই কালুকে ছেঁকে ধরেছে, দাওনা গো তোমার বার ভাজা, ওই ছেলেটাকে এখনি আমরা খাবো তোমার বার ভাজা দিয়ে।
কালু বললো তোমরা সবাই আমার কাছে এসো, আমার ঝাঁপি থেকে বার ভাজা বার করে সবার হাতে হাতে দিবো।
কালুর কথামত সবাই কালুকে ঘিরে বসলো।
কালু কাপড়ে বাঁধা মোড়ক খুলে ঝাঁপির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কি যেন খুজতে লাগলো।
কালু দিয়াশলাইটা হাতে পাওয়া মাত্র ঝাঁপির ভিতর ফড়াম করে আগুন জ্বালিয়ে দিল।
আগুন দেখামাত্র ভুতেরা ভয়ে দূরে সরে গেল, দাউদাউ করে ঝাঁপি সহ মোড়ক পুড়তে থাকে।
কালু বাচ্চাদেরকে কাছে ডাকতে বাচ্চারা ভিড়ে গেল।
কালু ঠাট্টা করে আর ভূতদেরকে বলে, আয় বার ভাজা খাবি না?
ভূতেরা রাগের চোটে দূর থেকে দাঁত খিটিমিটি করে আর বলে বেইমান, তোর ঘাড় মুটকে রক্ত খাবো।
কালু ভূতের কথায় কর্ণপাত না করে শুধু ভাবতে থাকে, বদমাইশ ভূতেরা এইভাবে কতশত বাচ্চাদের জীবন নষ্ট করেছে, তার কোনো হিসাব নাই।
সেই সব বাচ্চাদের জামা কাপড়ের একটা গাদা ছিল। কালুর কথামত যে যতটা পারলো, ওই গাদা থেকে জামা কাপড় নিয়ে, একটা একটা আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে সবাই ভূতের বাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। যেসব ভূতেরা বাইরে কালুদের ধরার অপেক্ষায় ছিল, প্রত্যেকের হাতে মশালের মতো আগুন দেখে তারা একটা একটা করে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
পিছন ফিরে কালু দেখে ঘণ পাতাই ঢাকা শেওড়া গাছের গোড়ায় সুড়ঙ্গ পথে আগুন ছিটকিয়ে বেরিয়ে আসছে।
আগুন দেখে কালু মনে-মনে ভাবতে থাকে, এবার ভূতুড়ে বাড়ি পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে।
এইভাবে কালু সকলকে উদ্ধার করে গ্রামে নিয়ে আসে। কালুকে গ্রামের লোকেরা খুব বাহবা দিল।
আশপাশ গ্রামেও কালুর এই দক্ষতার ঘটনা প্রচার হয়ে গেল।
কালুকে বাহবা দিয়ে যে যার ছেলে নিজ নিজ বাড়ি নিয়ে গেল।
কালুর এই দক্ষতার জন্য নিজের গ্রাম ছাড়াও আশপাশ গ্রাম থেকেও বকশিশ হিসাবে প্রচুর আর্থিক সাহায্য পেয়ে কালু দাঁড়িয়ে গেল।
হারানো ছেলে খুজে বার করতে থানার পুলিশ পর্যন্ত নাকাল হয়েছে। বহু চেষ্টা করেও পুলিশ কোনো সার উদ্ধার করতে পারেনি। কালু একাই সেটা করে সবাইকে দেখিয়ে দিল।
আজও কালুর চোখের সামনে ভেসে বেড়াই সেই বাচ্চাটার দৃশ্য, আর কানে বাজে কান্না, আমাকে ছেড়ে দাও, মায়ের কাছে যাবো!
আব্দুল মান্নান মল্লিক
বড় একটি মাঠ পেরিয়ে ওপারে কাজি পাড়া, বৈরি পোতা , লকেশগঞ্জ, হাতিমারা, এমনি দশ-বারটা গ্রাম নিয়ে একটি এলাকা।
কালুর বাড়ি এপারেই, লখিমপুর গ্রামে।
অভাবের সংসার। ওপারে গ্রামে গ্রামে বার ভাজা বিক্রি করে সে কোনোরকমে দিনপাত করত।
দিনটা ছিল পোষ মাসের শেষ শনিবার। কালু প্রতিদিনের ন্যায় আজও গেছে ওপারের গ্রামগুলিতে বার ভাজা বিক্রি করতে।
আজ কিভাবে যে কালুর সময় বয়ে গেল, কালু কিছুই বুঝতে পারল না।
প্রতিদিন মাথার উপর সূর্য উঠতে না উঠতেই কালুর বার ভাজা সব বিক্রি হয়ে যায়।
আজ সূর্য মাথা ছাড়িয়ে অনেকটা গড়ে গেছে, তবুও বার ভাজা অনেকটা রয়ে গেছে।
কালু ভীষণ চিন্তায় পড়লো। এত বড় মাঠ পেরিয়ে যেতে হবে তাকে। তাছাড়া যেখানে ভূতের আপাদানি তার পাশের রাস্তা ধরেই যেতে হবে আমাদের গ্রাম।
মাঠটিকে সবাই খাড়ির মাঠ বলেই ডাকে।
মাঠের চারিপাশের গ্রামগুলি ও দূরে-দূরে। এখানে কেউ বিপদে পড়ে চিৎকার চেঁচামিচি করলেও, আশপাশ গ্রামের কেউ শুনতে পাবেনা , যে ছুটে এসে তাকে উদ্ধার করে।
মাঠের মাঝে রাস্তার কাছাকাছি পানাতে ভরা একটি ডোবা আছে। ডোবাটির চার পাড়ে শেওড়া, কোথাও কোথাও দু-একটা কেওড়া গাছ, আর মাটি ছুঁয়ে আগাছায় ভরা। পাড়ের উপর ঈশান কোণে, ছোটো-বড় মিলে পাশা-পাশি দু-চারটে বেশ বড়-বড় তেঁতুল গাছ । দেখলেই বুঝা যায় জায়গাটি সুবিধা না, ভূতুড়ে। ভূতের ভয়ে ওখানে কোনো মানুষই যেতে চাইনা । অগত্যে বিশেষ প্রয়োজনে হয়ত কেউ যায়। তাও আবার দু-চার জন সঙ্গে করে। তাই বুঝি আশ-পাশ গ্রামের লোকেরা ডোবাটির নাম দিয়েছে ভূতগড়ি।
এমনিতে কালু ছিল প্রচণ্ড সাহসী। হলে হবে কি? ভূতের নাম শুনলে কে না ভয় পাই ?
যতই সাতপাঁচ ভাবতে থাকে , ততই ভয় বেড়ে যায় কালুর।
অগত্যে কি আর করবে, বাড়ি তো ফিরতেই হবে।
না আর কাল বিলম্ব করে লাভ নাই, এখনো হাতে সময় আছে, সন্ধের আগে বাড়ি পোঁছাতেই হবে। এই বলে কালু টানা টানা পা ফেলে পথ হাঁটতে শুরু করে, আবার মাঝে-মাঝে দৌড়ে চলে।
এত দৌড়েও পথ যেন ফুরাতে চায়না। পশ্চিমে ঢলে পড়া সূর্যটা ও যেন কালুর সাথে পাল্লা দিয়ে চলেছে।
ঠিক তাই, কথাই বলেনা যেখানে ভূতের ভয়, সেখানেই সন্ধ্যা হয়। এত চেষ্টার পরেও, কালুর ঠিক তাই ঘটলো। ভূতগড়ির সোজাসুজি রাস্তায় পৌঁছানোর আগেই সূর্য তার নিজের আসনে বসে পড়েছে।
নেমে আসলো আবছা অন্ধকার।
ভয়ে কালুর পথ চলা স্তব্ধ প্রায়। ভাবছে এই হয়তো ভূতেরা এসে আমাকে ধরে নিয়ে যাবে ওদের আকড়াতে,তারপর সবাই মিলে আমাকে ছিঁড়ে ছিঁড়ে খাবে |
এই কথা ভাবতে ভাবতে কালুর হাত পা ভয়ে অসাড় হয়ে আসছে ।
একি! কালু দেখল, বিশাল আকারের ছায়ার মতো কি যেন একটা ভেসে ওর দিকেই এগিয়ে আসছে। কাছে আসতেই অস্পষ্টে দেখা যায় একটি ছায়া ছায়া তেঁতুল গাছ । আর গাছের ডালে-ডালে জনা বিশেক ছায়ামূর্তি। তেঁতুল গাছটি কালুর সামনে এসে দাঁড়িয়ে যেতেই, কালু ভীষণ ভয় পেয়ে পিছন ফিরে সোজা দৌড় দিল। চেনা-চেনা গলায় কে যেন পাশ থেকে বললো, এই কালু, অমন করে ডৌড়াচ্ছিস কেনরে? কালু ভয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে। কাছে আসতেই দেখে, কালুরই বন্ধু নন্দ। কালু দম চেড়ে জিজ্ঞেস করে তুই এখানে কি করছিস? আগে তুই বল, অমন করে দৌড়াচ্ছিলি কেন।
কালু হাঁপ ছেড়ে বলে, ভাইরে! সেকথা আর বলিস না ( বলে কালু তার সমস্ত ঘটনা নন্দকে বললো।) সবকিছু শুনার পর নন্দ বলে, তাহলে তোর আমার একই হাল ? আমি বিশেষ একটা প্রয়োজনে বৈরি পোতা গেছিলাম। ফিরে আসতেই এখানে সন্ধ্যা হয়ে গেল, অমনি ভিতরে ঢুকে গেল ভূতের ভয়। শুনেছি ভূতগড়িতে নাকি ভূত থাকে, তাই না পারছি এগিয়ে যেতে, না পারছি পিছিয়ে আসতে। যাক্, তোকে যখন সঙ্গে পেয়েছি, আর ভয় কিসের।
আয় ত দেখি আমার সঙ্গে । তুই পিছন পিছন আয়, আর আমি আগে আগে যায়। দেখি কোথায় শালার ভুত।
এইভাবে দুজনে চলতে লাগলো।
কেমন যেন একটা ধুঁ-ধুঁ গন্ধে কালুর শরীরটা ঝাঁকুনি দিয়ে উঠলো।
নন্দ জিজ্ঞেস করে, তোর খুব ভয় পাচ্ছে, না রে ?
অগত্যে ভয়কে আড়াল করে কালু বললো কৈ-কৈ না--তো!
কালুর খটকা বাঁধে, আমার মনের কথা নন্দ জানলো কি করে ? তাছাড়া ওর গায়ে এমন ধুঁ-ধুঁ গন্ধ এল কোত্থেকে? চলতে চলতে কালু মনে-মনে এই-ই ভাবতে থাকে।
হঠাৎ করে কালু দেখে চমকে উঠে, একি! নন্দর গায়ের জামাটা কোথায় গেল? গায়ে বড় বড় লোম! তবে কি এ নন্দ না? নিশ্চয় ওই দলেরই কেউ হবে। সর্বনাশ, আমি কি তাহলে ভূতের জালে জড়িয়ে পড়েছি? এখন উপায়! যেই ভাবা, অমনি ভুতটা বলে খবরদার, পালাতে চেষ্টা করিস না। পালাতে চেষ্টা করলে এখনি তোকে চিবিয়ে খাব, বলে কালুর দিকে মুখ ফিরাতেই কালু দেখতে পেল, কি বীভৎস চেহারা, সর্বাঙ্গে বড় বড় লোম, আর বেরিয়ে এল তার ঠোটের দুই কোণ থেকে দুটি বাঁকা বড় বড় ধারালো দাঁত। এই দেখে কালু জ্ঞান হারা হয়ে গেল।
কতক্ষণ যে সে অজ্ঞান অবস্থায় ছিল কিছুই বুঝতে পারলো না। জ্ঞান ফিরতেই কালু দেখতে পেল, একটা আবদ্ধ ঘরে একাই শুয়ে আছে। একেবারে নিস্তব্ধ। ভালো করে নজর দিয়ে দেখতে থাকে আর ভাবে, আমি কোথায় এসেছি? হাঁ, মনে হয় সেই, নন্দর রূপ ধরেছিল সেই বদমাইশ শয়তানটা আমাকে এখানে নিয়ে এসেছে। ঘরটা ত দেখে মনে হয় অনেকদিনের পুরানো, ভূতুড়ে বাড়ি ।
কালু আস্তে আস্তে উঠে বসে, আর ভাবতে থাকে, না ভয় পেলে চলবে না। যেভাবেই হোক ভূতের খপ্পর থেকে নিজেকে বাঁচাতেই হবে।
কালু ঘর থেকে বেরোতে অনেক চেষ্টা করেও কোনো লাভ হল না। দরজা ধরে টানাটানি করেও কাজ হল না। সেটাও বাইরে থেকে বন্ধ করা। কালু পিছন দিকে একটি জানালা দেখতে পেল। তাতে সূক্ষ্ম একটি ছিদ্র আছে। কালু চক্ষু মেলে ছিদ্র দিয়ে দেখে একেবারে থ! অন্ধকার হলেও কষ্ট করে বুঝা যায়, সাট-সাট হয়ে দশ-বারটা বাচ্চা বাচ্চা ছেলে ঘুমন্ত অবস্থায় এবড়োখেবড়ো হয়ে পাশের ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে।
এই দৃশ্য দেখার পর কালু ভাবতে লাগলো, ওই শালারা হয়ত গ্রাম গঞ্জ থেকে উদর পূরণের জন্য ধরে এনেছে।
যেভাবেই হোক, নিজেকেও বাঁচাতে হবে, বাচ্ছেদেরকেও বাঁচাতে হবে। আমি ত ওদের হাতে ধরা পড়েই গেছি। তাছাড়া মরতে ত একদিন হবেই, আজ নইতো কাল। ওই শালার ভূতেরাও বুঝতে পারবে, কালুর গায়ে হাত দেওয়ার জ্বালাটা। একবার খপ্পর থেকে বেরোতে পারলে হয়।
ভাবতে ভাবতে দরজা খুলে ঢুকে পড়লো, সেই শয়তান ভূতটা, সঙ্গে আরও দুটো।
সর্বনাশ, শয়তানটা আবার আমার মনের কথা বুঝতে পারেনি তো? কালুর মনে বার বার একই প্রশ্ন জাগে। আবার ভাবতে থাকে না না, ভূতেরা একইসঙ্গে চতুর্দিক ভাবতে পারেনা। ওরা ত ওদেরকে নিয়েই ব্যস্ত।
এমন সময় আর একটি ভূত এসে বললো, এই পেঙু, তোদেরকে সর্দার ডাকছে, আর সঙ্গে যে মানুষ এনেছিস ওটাকেও নিয়ে আয়, এই বলে চলে গেল।
সর্দারের কথা মত কালুকে নিয়ে গেল সেই ঘরে, যেখানে বাচ্চাগুলো ঘুমিয়ে ছিল।
কালু দেখে, এবড়োখেবড়ো হয়ে ঘুমিয়ে পড়ে থাকা বাচ্চাগুলো সবাই এখন জেগে রয়েছে।
কালুকে দেখামাত্র একটি বাচ্চা চিনতে পেরে কাছে আসতে চেষ্টা করলে, কালু ইশারা দিতেই বাচ্চাটা চুপ হয়ে গেল।
আসলে বাচ্ছাটা ওদের পাশের বাড়ির। এই নিয়ে কত থানাপুলিশ হয়ে গেছে। আজও কোনো সার-উদ্ধার হয়নি তার।
লখিমপুর ও তার পার্শ্ববর্তী গ্রামগুলিতে ছেলে হারানোর খবর প্রায় মাঝে-মধ্যে শুনতে পাওয়া যায়। অনেক খুঁজাখুঁজি করেও, আজ পর্যন্ত একটির ও সন্ধান মিলেনি।
এলাকার সবার ধারণা, কেউ হয়তো পাচার করছে। এর পিছনে বড় রকমের হাত আছে। তাই অচেনা পথচলতি বহু লোক সন্দেহের জালে পড়ে, এই এলাকার লোকের হাতে বেদম মারও খেয়েছে। আবার অচেনা কাউকে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছে । তারাও কেউ আজ অবধি ছাড় পাইনি, জেলেই পচছে।
এবার বুঝি ওদের উদর পূরণ করতে কালু এসেছে।
ওদের নাঁকি সুরের কথাগুলো কালু সবটা না বুঝলেও আকার ইঙ্গিতে কিছুকিছু বুঝতে পারছে। সর্দারের ভাগে পড়লো আমার মাথা, কেউ বলছে আমার পা, আর একজন বলছে বাকি একটা পা আমার। আর একজন ছুটতে ছুটতে এসে বলে আমি মানুষের হাত খেতে খুব ভালোবাসি। একটি বৃদ্ধা ভূত বলে কি না,তোরা যে যা খাবি খাস, আমার জন্য কলিজাটা রাখিস যেন,হাঁ।
কালু জেন্ত থাকতেই তার অঙ্গপ্রত্যঙ্গ নিয়ে ভাগাভাগি চলছে।
এমন সময় ভূতের সর্দার বললো, তোরা শুধু বক্-বক্ করবি, না কিছু খাবি? খিদে পাইনি তোদের?
বাকি ভূতেরা বললো হাঁ-হাঁ, আমাদেরও খুব খিদে পেয়েছে।
পেঙু বলে, তাহলে আর দেরি কেন? মানুষটাকেই এবার খেয়ে ফেলি ?
সর্দার বললো, নারে না, ওকে এখন খাব না। এখন ছোটোখাটো কিছু খেলেই সবার টিফিন মতো হয়ে যাবে। ভালো করে স্নান-টান করে তারপর তৃপ্তির সাথে মানুষটাকে খাব।
সর্দারের কথায় ভূতেরা সবাই সাঁই দিল।
সর্দারের কথামত পেঙু সবচেয়ে ছোটো বাচ্চাকে ধরে আনতেই, বাচ্চাটা কান্না করে আর বলে, আমাকে ছেড়ে দাও, আমি মায়ের কাছে যাব, মা বাড়িতে আমার জন্য খুব কান্নাকাটি করছে।
নিষ্ঠুর প্রাণ ভুতের। কারও কান্নায় ওদের মন গলে না, বরং কানে ব্যথা লাগে। তাই বাচ্চাটার কান্না পেঙু সহ্য করতে না পেরে, ঘাড় মুটকে দিয়ে চিরদিনের মত চুপ করিয়ে দিল।
তারপর বীভৎস চেহারা ধারণ করে ভূতেরা সব বাচ্চাটার শরীরে বিষাক্ত দাঁত ফুটিয়ে বাচ্চাটার সমস্ত রক্ত শোষণ করে নিল।
কালুর সম্মুখে এই দৃশ্য দেখে কালু খুব কষ্ট পেল। রাগে কালুর ইচ্ছা হচ্ছিল ওদের সঙ্গে মারপিট আরম্ভ করে দিই। পরক্ষণেই ভাবলো না, তাতে কোনো লাভ হবে না, উলটে নিজেকেও বাঁচাতে পারব না, বাকি বাচ্চাদেরকে ও না।
অনেক কষ্টে অশ্রু সংবরণ করে চুপচাপ বসে রয়েছে কালু।
শয়তান ভূতেরা বাচ্চাটার রক্ত শোষণের পরে এবার ছিঁড়ে ছিঁড়ে মাংস খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
এদের নোংরামি ব্যাপার-স্যাপার দেখে কালুর রাগ একেবারে চরমে উঠে গেছে।
কালুর বুঝতে আর বাকি রইলো না। যত বাচ্চাদের অনিষ্টের কারণ এখানকার ভূতেরাই।
কালু মনে মনে বিভিন্ন রকম ফন্দি আঁটতে থাকে, সবই কেটে যাচ্ছে, কোনোটাই যেন কাজে আসছে না।
হঠাৎ করে কালুর মনে পড়ে গেল বড়দের কথা।
ভূতেরা নাকি আগুন দেখে খুব ভয় পায়।
কালু এবার অনেকটা আশ্বাস পেয়ে ভাবতে থাকে, দাঁড়া দেখাচ্ছি মজা।
কালুর মনে পড়ে গেল, তার ঝাঁপির মধ্যে বিড়ি আর দিয়াশলাই আছে।
কালু মনে মনে ফন্দি বেঁধে ভূতের সর্দারকে বললো তোমরা মাংস খাওয়ার কৌশল কি, সেটা ও জান না?
ভূতের সর্দার বললো, কেন? মাংস আবার কিভাবে খেতে হয়। আমরা ত গোটা মানুষ ধারালো দাঁত দিয়ে ছিঁড়ে-ছিঁড়ে খায়।
কালু বললো, তাইতো বলি, ভূত না অদ্ভুত।
আমরা মাংস খাই বার ভাজা দিয়ে।
সর্দার বললো, এখন আমরা বার ভাজা কোথায় পাবো?
কালু বললো এইতো আমার ঝাঁপিতেই আছে।
ভূতেরা আনন্দে আত্মহারা হয়ে নাচতে লাগলো, বা-বা-- কি মজা, আজ আমরা বার ভাজা দিয়ে মানুষের মাংস খাবো।
সবাই কালুকে ছেঁকে ধরেছে, দাওনা গো তোমার বার ভাজা, ওই ছেলেটাকে এখনি আমরা খাবো তোমার বার ভাজা দিয়ে।
কালু বললো তোমরা সবাই আমার কাছে এসো, আমার ঝাঁপি থেকে বার ভাজা বার করে সবার হাতে হাতে দিবো।
কালুর কথামত সবাই কালুকে ঘিরে বসলো।
কালু কাপড়ে বাঁধা মোড়ক খুলে ঝাঁপির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কি যেন খুজতে লাগলো।
কালু দিয়াশলাইটা হাতে পাওয়া মাত্র ঝাঁপির ভিতর ফড়াম করে আগুন জ্বালিয়ে দিল।
আগুন দেখামাত্র ভুতেরা ভয়ে দূরে সরে গেল, দাউদাউ করে ঝাঁপি সহ মোড়ক পুড়তে থাকে।
কালু বাচ্চাদেরকে কাছে ডাকতে বাচ্চারা ভিড়ে গেল।
কালু ঠাট্টা করে আর ভূতদেরকে বলে, আয় বার ভাজা খাবি না?
ভূতেরা রাগের চোটে দূর থেকে দাঁত খিটিমিটি করে আর বলে বেইমান, তোর ঘাড় মুটকে রক্ত খাবো।
কালু ভূতের কথায় কর্ণপাত না করে শুধু ভাবতে থাকে, বদমাইশ ভূতেরা এইভাবে কতশত বাচ্চাদের জীবন নষ্ট করেছে, তার কোনো হিসাব নাই।
সেই সব বাচ্চাদের জামা কাপড়ের একটা গাদা ছিল। কালুর কথামত যে যতটা পারলো, ওই গাদা থেকে জামা কাপড় নিয়ে, একটা একটা আগুন জ্বালাতে জ্বালাতে সবাই ভূতের বাড়ি থেকে বাইরে বেরিয়ে এল। যেসব ভূতেরা বাইরে কালুদের ধরার অপেক্ষায় ছিল, প্রত্যেকের হাতে মশালের মতো আগুন দেখে তারা একটা একটা করে কোথায় অদৃশ্য হয়ে গেল।
পিছন ফিরে কালু দেখে ঘণ পাতাই ঢাকা শেওড়া গাছের গোড়ায় সুড়ঙ্গ পথে আগুন ছিটকিয়ে বেরিয়ে আসছে।
আগুন দেখে কালু মনে-মনে ভাবতে থাকে, এবার ভূতুড়ে বাড়ি পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে।
এইভাবে কালু সকলকে উদ্ধার করে গ্রামে নিয়ে আসে। কালুকে গ্রামের লোকেরা খুব বাহবা দিল।
আশপাশ গ্রামেও কালুর এই দক্ষতার ঘটনা প্রচার হয়ে গেল।
কালুকে বাহবা দিয়ে যে যার ছেলে নিজ নিজ বাড়ি নিয়ে গেল।
কালুর এই দক্ষতার জন্য নিজের গ্রাম ছাড়াও আশপাশ গ্রাম থেকেও বকশিশ হিসাবে প্রচুর আর্থিক সাহায্য পেয়ে কালু দাঁড়িয়ে গেল।
হারানো ছেলে খুজে বার করতে থানার পুলিশ পর্যন্ত নাকাল হয়েছে। বহু চেষ্টা করেও পুলিশ কোনো সার উদ্ধার করতে পারেনি। কালু একাই সেটা করে সবাইকে দেখিয়ে দিল।
আজও কালুর চোখের সামনে ভেসে বেড়াই সেই বাচ্চাটার দৃশ্য, আর কানে বাজে কান্না, আমাকে ছেড়ে দাও, মায়ের কাছে যাবো!
No comments:
Post a Comment