Tuesday, 18 August 2020

স্বপ্নপুরী



স্বপ্নপুরী

আব্দুল মান্নান মল্লিক

তোমরা নিশ্চয় শুনেছ এই স্বপ্নপুরী মাঠের ঘটনা। সাগরের পর সাগর পেরিয়ে জনমানবহীন এক বিশাল মাঠ। শুধুই ধু-ধু করে, কোথাও কোথাও বালি পাথরের উঁচু নীচু ঢিবি। সমস্ত মাঠটা কাঁকুরে ভর্তি ও খাঁ-খাঁ করছে। দিনের বেলায় ঐগলো এমন উত্তপ্ত হয় যে, পা রাখা যায় না। মনে হয় এ যেন আমাদের এই পৃথিবীর বাইরে এক নতুন পৃথিবী। এই মাঠের কোথায় যে শেষ কে বা জানে। তবে পায়ে হেঁটে প্রায় তিন মাস চলার পর কোথাও কোথাও দু-একটা গুল্মজাতীয় গাছ দেখা যায়। এরপর থেকে যতই চলা যায়, এই সব গাছগাছালি ক্রমাগত বেশী দেখা যায়। আরও বেশ কয়েকদিন পথ চলার পরে এক গভীর অরণ্য। এমন গভীর অরণ্য পৃথিবীতে আর কোথাও আছে বলে মনে হয় না। তবে নিশ্চিন্ত যে, এখানে কোন হিংস্র বন্যপ্রাণীদের চিহ্নমাত্র নাই। কিছু কিছু রং-বেরঙের প্রজাপতি ও পাখি দেখতে পাওয়া যায়।
        জঙ্গলের গভীরে প্রবেশ করলে মনে হয়, এ যেন এক দিশেহারা কোন এক অলৌকিক স্বপ্নযাত্রীর যাত্রা। কোথাও কোথাও সুচি ছিদ্র দিয়ে সুর্যের আলো প্রবেশ করে। বিভিন্ন রকম ফুল ও ফলের গাছ। এখানে না খেয়ে কেউ মরবে না। কারণ যেমন ইচ্ছা তেমনি ফল খাও আর ঘুরে বেড়াও। হাঁ কেউ যদি একবার আসে আর ফিরতে ইচ্ছা করবে না। মনে হয় ঈশ্বর হয়তো মাঝেমধ্যে স্বয়ং পায়ে হেঁটে এসে পুরো অরণ্যটাকে দেখাশোনা করেন, তাই এত সৌন্দর্য হয়ে উঠেছে।
জঙ্গলের প্রায় মাঝামাঝি জায়গায় এক বিশাল দিঘী। এটাই হচ্ছে গল্পে শোনা সেই পদ্মদিঘী। চক্ষু একেবারে জুড়িয়ে যায়। চারিদিকে কত সুন্দর সুন্দর গাছপালা, ফল ও ফুলে ভরা। পদ্মভরা দিঘী, রং-বেরঙের কত ফুল ফুটে আছে, আর রং-বেরঙের প্রজাপতিগুলো সুন্দর সুন্দর ফুলগুলোকে চুম্বন দিয়ে, আবার অন্য ফুলের উপর বসছে। তেমনই বিভিন্ন রঙের ছোট ছোট পাখিগুলো ঐ ফুল ও পাতার উপর কত সুন্দর খেলছে। গাছের উপরে ও কত রকমের রংবেরঙের ছোট ছোট পাখি। পাখিগুলো সব একসঙ্গে গাইতে শুরু করলে, মনে হয় বাদ্যযন্ত্র বাজছে।
          আঃ! এত সুন্দর দৃশ্য কার না ভালো লাগে? নামের সঙ্গে নিখুঁত ভাবে মিল আছে বটে। লতাপাতার ফাঁক দিয়ে দেখা যায় দিঘীর নীল জল। স্তব্ধ দিঘীর নীল জল দেখলে মনে হয় যেন, পদ্মদিঘী নিজের সৌন্দর্যের অহঙ্কারে গাম্ভীর্য প্রকাশ করছে।
           হঠাৎ মনে পড়ে যায় ঠাকুরদার কথা, এটাই কি সেই স্বপ্নপুরী? যে সপ্নপুরীর ঘটনা ঠাকুরদার কাছে ছোট্ট বেলায় শুেনছিলাম। এখানেই কি নীলা পরীর বাস ?
            পরীধামের রাজা ছিলেন ভুবন, তিনি ছিলেন ন্যায়পরায়ণ ও ধর্মপরায়ন। তাই সবাই তার উপর বিস্বাস ও ভরসা রেখে তাকেই পরীধামের রাজা বানিয়েছিল। তিনিই হলেন পরীধামের রাজা, পরীরাজ। পরীরাজের তিন কন্যার ছোট কন্যা এই নীলা পরী। পরীরাজের খুব আদুরে কন্যা। যখন যা চাইত তাই পেত। বাচ্চাবেলায় ফুল ও পাখিদের সঙ্গে খেলতে খুব ভালবাসত। পরীরাজের একটি হীরণ্য নামে সৌখিন পাখি ছিল। নীলা ওই পাখির পিঠে চেপে সময় সময় উড়ে বেড়াতে ও খুব ভালবাসত।
           এই পরীধাম হইতে বেশ কিছুটা দূরে এক ডাইনী পরীর বাসস্থান। ডাইনী ছিল রক্তশোসক, ওখানকার সকলেই পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছে, এই ডাইনী পরীর দূরদৃষ্টির শিকার হয়ে। ডাইনী দৃষ্টির নাগালে কাউকে পেলে ওখান থেকেই তার রক্ত শোসন করে নিত, ধীরে ধীরে কয়েকদিনের মধ্যেই সে শুকিয়ে মারা যেত। শেষ বয়সে ডাইনী পরীর সেবা করার আর কে ছিল না। তাই নীলাকে পরীধাম হইতে চুরি করে নিয়ে আসে, নিজের সেবার জন্য। নীলা বহু কান্নাকাটি করলে ও ডাইনী কখনোই তার কাছ ছাড়া হতে দেয় নি। ডাইনী নীলাকে অনেক বোঝাতো, আজ থেকে আমিই তোর মা, আমাকে তুই মা বলে ডাকবি। এই বয়সে তুই যদি আমাকে ছেড়ে চলে যাস তাহলে আমার কি হবে! কে বা দেখাশোনা করবে। তোকে আমি খুব ভালোবাসি, তুই ছাড়া আমার আর কে আছে বল?
            আয় আমার সঙ্গে, আয়না এই পাশের ঘরে, বলে নীলাকে পিছন পিছন নিয়ে গেল। নীলার অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভয়ে ভয়ে যেতে বাধ্য হল। নীলা ডাইনী পরীর হাতে দুটো কাঠি দেখতে পেল। একটা কালো আর একটা সাদা রঙের, সাদা কাঠিটা ঠেকাতেই ঘরের দরজা খুলে গেল। ঘরের দিকে তাকাতেই নীলার চক্ষু একেবারে ধাঁধিয়ে গেল। সোনাদানা, হীরাতে একেবারে ঘর ভরতি।
         ডাইনী নীলাকে বললো এই ঘরে যত সোনাদানা দেখছো আজ থেকে এইসবের মালিক তুই। নীলার এইসবের উপর মোটেই লোভ ছিলনা, তবুও ডাইনী পরীর কথামত ঘাড় নেড়ে সাঁই দিল। আর একটা পাশের ঘর দেখে নীলা জিজ্ঞাসা করলো মা, ওই ঘরটাতে কি আছে? ডাইনি পরী বললো, ওটা তোর এখন জানার দরকার হবেনা। প্রয়োজনে ও সময়ে আমি সব বুঝিয়ে বলব, বলে কালো কাঠি ঠেকাতেই দরজাটা আবার বন্ধ হয়ে গেল। নীলা পরী সবটাই নিখুঁত ভাবে পরখ করে চলে। কারণ নীলা পরীর একটাই উদ্দেশ্য, ডাইনী পরীকে একেবারে শেষ করে দিয়ে এখান থেকে বেঁচে পালাতে হবে।
        রাতে শুয়ে নীলার কিছুতেই ঘুম আসছেনা। বিভিন্ন চিন্তায় ভিড় করছে নীলার মনে।
ডাইনী জিগ্যাসা করলো, মা তুই এখনো ঘুমাসনি? নীলা বললো, না মা, আমার ঘুম আসছেনা।
ডাইনী বললো, তুই কিছু চিন্তা করছিস মা?
নীলা বললো হাঁ মা।
ডাইনী বলে কেন, কিসের চিন্তা? আমিতো তোর পাশে আছি।
নীলা বললো, আজ তুমি আছ, আর যেদিন তুমি থাকবেনা সেদিন আমার কি হবে? কে আমাকে দেখবে?
শনে ডাইনী বলে, আরে পাগলী আমি থাকবোনা, এ কথা তোকে কে বললো?
নীলা বললো, একদিন না একদিন তো সকলকেই মরতে হবে।
ডাইনী বলে, দূর পাগলী, আমি কোনদিন মরবনা। আর আমার যাতে মরণ হবে, কেউ তা জানেনা, আর কেউ কোনদিন জানতে পারবেওনা।
জানিস নীলা, আমার কিসে মরণ হবে? সুধু মাত্র তোকেই আজ আমি বলছি, কিন্তু কোনদিন কাউকে বলিসনা।
নীলা বললো মা, কেউ কোনদিন নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারতে পারে? তাহলে আমার কি হবে?
ডাইনি এবার বলতে লাগলো শোন তাহলে, পাশের যে ঘরটার কথা তুই জিগ্যাসা করছিলি, ওটা আমার জীবন ঘর। ঐ ঘরে একটা ছোট্ট পুতুল আছে। ঐ ঘরে কেউ যদি ঢুকে ঐ পুতুলের মাথা কেটে ফেলে, তাহলে আমি যেখানেই থাকিনা কেন আমার মাথা কেটে সেখানেই পড়ে যাবে, তখন আমি সঙ্গে সঙ্গে মারে যাবো। ঐ পুতুলের যে অঙ্গের ক্ষতি হবে আমারও সেই অঙ্গ চিরদিনের মতো নষ্ট হয়ে যাবে। ঐ ঘর কেউ কোনদিন খুলতে পারবেনা, কারণ ওর চাবি আমার হাতে। এই সাদা কাঠি আর এই কালো কাঠি।
এই কথা শুনার পরে নীলা মনে মনে ফন্দি আঁটতে থাকে, কিভাবে ঐ পুতুল ধংস করে শয়তানি ডাইনিকে মারা যায়!
          এইভাবে দিন যায় রাত যায়, নীলার পুতুল ধংস করার সুযোগ ঠিকমতো হয়ে ওঠে না। আর এই ফন্দি যদি ডাইনী পরি টের পেয়ে যায় তাহলে নীলার আর রক্ষা থাকবেনা। নিলাকে খুব সাবধানে কাজ করতে হবে। একদিন রাতের বেলায় ডাইনি বিভোর ঘুমে ঘুমিয়ে পড়লো। এই সুযোগে নীলা খুব সাবধানে উঠে ডাইনী পরীর মাথার কাছে রাখা কাঠি দুটোকে নিয়ে চুপিচুপি গিয়ে ডাইনি পরীর জীবন ঘরের দরজায় সাদা কাঠিটা ঠেকাতেই ঘর খুলে গেল। নীলা ঘরের একটি পুতুল ছাড়া আর কিছু দেখতে পেলনা। সোজা গিয়ে পুতুলটা হাতে নিয়ে প্রথমে একটা ঠ্যাং ভাঙতেই ভীষণ চিৎকারের আওয়াজ শুনতে পেল নীলা। দেরী না করে নীলা পুতুলের মুন্ডুটা টেনে ছিড়ে ফেলতেই চিৎকার চেঁচামেচি বন্ধ হয়ে গেল। ঘর থেকে বেরিয়ে এসে নীলা দেখলো, ডাইনী পরী মৃত অবস্থায় ঘরের বারান্দা পড়ে আছে। দেখেই বোঝা যায় ডাইনি শুধু চিৎকারই করেনি, প্রচন্ড ছটফটও করেছে।
       তখন নীলা বেশ আকাশ পথে ও উড়তে শিখে গেছে। পরীদের কেউ যদি তিন মাস ঘরছাড়া হয়, সামাজিক ও ধর্মীয় নিয়মানুযায়ী তাকে আর কোনো দিন ও ঘরে তোলা হয় না। তাই এই সাত পাঁচ ভেবে নীলা পরী আর ঘরে ফিরে যায় নি। কারণ পরীধামের রাজা হচ্ছে পরীরাজ, নিজের বাবা। নীলা চাই না পরীধামের অমর্যাদা ও ধর্মের অবমাননা হক। আর তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাবার মান মর্জাদা। তাই নীলা ডাইনীর এলাকা ছেড়ে  আশ্রয় নিয়েছিল এই স্বপ্নপুরীতে।
এখানে নীলার আপনজন বলতে কেউ ছিল না। পরবর্তীকালে নীলাম্বর ও নীলাম্বরী এই দুই দুঃসাহসী পাখি নীলার খুব কাছের বন্ধু হয়। নীলাম্বর আর নীলাম্বরী কেউ কাউকে ছেড়ে থাকতে পারত না। খেলতে খুব ভালবাসত, খেলতে খেলতে দুজনে এক সময় নীল আকাশের মধ্যে কোথাই হারিয়ে যেত। তাই পাখি দুটো নীলাম্বর ও নীলাম্বরী নামেই পরিচিত।
        পাখি দুটোকে নিয়েই নীলা পরী এখানে সুন্দর একটি ঘর বেঁধেছিল। নীলা কখনো কখনো ঘুমের ঘোরে বাবা মায়ের স্বপ্ন দেখে কাঁদতে থাকলে, নীলাম্বর ও নীলাম্বরী মিস্টি সুরে গান গেয়ে আবার ঘুম পাড়িয়ে দিত। পাখি দুটোকে নীলা নিজের প্রানের চেয়েও বেশী ভালবাসতো। তেমনি তারাও নীলাকে খুব ভালবাসত। পাছে নীলার যেন কোনও প্রকার অসুবিধা বা ক্ষতি না হয়। সেদিকে নীলাম্বর ও নিলাম্বরী খুব সজাগ ছিলো। নীলা যখন যা বলত নিমেষের মধ্যে সেটাই করত। এই ভাবেই তারা দিন কাটাতে থাকে।
পরবর্তীতে কি হয়েছিল সেটা আমার ঠাকুরদার কাছে শোনা হয়নি।

No comments:

Post a Comment