ফুল ফুটলেই—গাছ চেনা যায়
আব্দুল মান্নান মল্লিক
বেশ অনেকদিন আগের কথা, বয়স তখন আমার বত্রিশ, কি পঁয়ত্রিশ হবে হয়তো।
একটা বিশেষ কাজের জন্য কলকাতা বেরিয়েছি।
ট্রেনে উঠে সুবিধা মতো বসার জায়গা খুজছি।
জানালার ধারে বসে আছে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক । বয়স -- আনুমানিক বাষট্টি কি পঁয়ষট্টি।
ভদ্রলোকের পাশে একজনের বসার মতো জায়গা খালি পড়ে আছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি বসার মতো আর কেউ ছিলনা, তাই আমি নিজেই বসে পড়লাম।
নিজের এলাকার বাইরে খুব বেশি চলাফেরার অভ্যাস আমার ছিলনা, তাই একটু সঙ্কোচ বোধে জড়সড় হয়ে বসেছি। বৃদ্ধ লোকটি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন ভালভাবে বসো। ভদ্র লোকটির কথা শুনে একটু গা ছেড়ে বসলাম। এমনিতে আমি গেঁয়ো, তাছাড়া অচেনা যাত্রীর ভিড়ে নিজেকে কেমন যেন লজ্জিত ও বোকাবোকা মনে হচ্ছিলো।
মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করতে লাগলো ভদ্রলোকটির চশমার কথা। দেখলাম কাঁচ বিহীন একটা তারের ফ্রেম মাত্র। ভাবলাম বয়স্ক লোক, চশমার প্রয়োজন না হলেও নিজের দৃশ্য সভ্য বজায় রাখতেই শুধুমাত্র তারের ফ্রেমটাই ব্যাবহার করছেন। ভাবতে ভাবতে দেখি তারের ফ্রেমটা খুলে ভদ্রলোক ধুতির আঁচল দিয়ে চশমার কাঁচটা পরিষ্কার করে আবার নাকের উপর বসিয়ে নিলেন। তখন বুঝতে পারি, যেটা ভাবছিলাম তা নয়। বেশ মর্যাদাশালী ব্যক্তি, চশমাটিও বেশ দামি।
চানাচুরওয়ালাকে ডাক দিয়ে বললেন, দু প্যাকেট গেঞ্জি রায়ের চানাচুর দিয়ে যা। অনেকদিনের পুরানো কথা, তাই ভালো মনে পড়েনা চানাচুরের নামটা। তবে গেঞ্জি রায়, এঞ্জি রায়, নাহলে এন জি রায়, এই তিনটের মধ্যে একটা অবশ্যই হবে। আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভদ্রলোক একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বললেন খাও খাও, এটা ট্রেনের নামকরা চানাচুর। বাইরে কোনো দোকানে পাওয়া যায়না।
অগত্যা খেতে শুরু করেছি। দুজনে চানাচুর খেতে খেতে একথা সেকথার মধ্যে দিয়ে আমাদের সম্পর্কটা খুব কাছাকাছি হয়ে গেল। বৃদ্ধ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ?
আমি বললাম কলকাতা বড়বাজার যাবো।
বৃদ্ধ বললেন বাঃ, ভালোই হল। আমারও বড়বাজারের কজটা সেরে তারপর হাওড়া যাবো। বড়বাজার পর্যন্ত এক সঙ্গে যাওয়া যাবে। কথায় কথায় এক সময় ট্রেন শিয়ালদহ স্টেশনে পৌছে গেল।
ট্রেন থেকে নেমে হাতে মুখে জল দিয়ে, ফ্যানের নিচে মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে, দুজনে আবার হাঁটতে শুরু করেছি। বড় বাজারের কাছাকাছি পৌঁছতেই দেখি রাস্তার ধারে বেশ কিছু মানুষ ভিড় জমিয়ে হৈ-চৈ করছে।
বৃদ্ধ বললেন তুমি একটু দাঁড়াও ব্যাপারটা একটু বুঝে আসি। বৃদ্ধের ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে, আমিও মানুষের ভিড় ঠেলে গলা বাড়িয়ে দেখি, যে যেমন পারছে একজনকে কিল ঘুসি মারছে।
আরও দেখলাম, ওই বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিও দুই ঘুসি মেরে বেরিয়ে আসলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওখানে দেখলাম, একজনকে যে যেমন খুশী মারছে! ওই লোকটি এমন কি করেছে?
জবাবে ভদ্রলোক বললেন, আমিও ঠিক বুঝলাম না।
আবার জিজ্ঞেস করি, আপনিও মারলেন যে?
ভদ্রলোক বললেন, কি জানি কি ব্যাপার, সবাই মারছে দেখে আমিও দু-ঘুসি লাগিয়ে দিলাম।

No comments:
Post a Comment