Thursday, 17 November 2016

মা

মা

আব্দুল মান্নান মল্লিক

তখন আমার বয়স দেড় মাস। খুব বড় না হলেও খুব ছোটো ছিলনা সেই বীলটি। ওপারে জল ছেড়ে বালিয়াড়ির উপর কাশবন, আর এপারে পাড়ের উপর বিভিন্ন জাতের বড়বড় গাছ, আর নিচে ছোট ছোট আগাছায় ভরা। একটি বড়সড় পিটুলি গাছে ছিল আমাদের বাসা। ওটাই আমার জন্মস্থান। শুধু মা আর আমি। গায়ের রঙ কালো বলে অন্যান্য পাখিরা আমাদের সঙ্গে মিশতে চায়না।
মাঝভর শীতকাল। যখন আমি ডিম ফুটে বেরিয়ে আসি পৃথিবীর আলোতে, তখনও আমার কাছে গোটা পৃথিবীটা অন্ধকার। দুই-তিনদিনের মধ্যেই আমার চক্ষু আস্তে আস্তে খুলে যায়। সেদিনই আমার প্রথম সূর্যের আলো দেখা। সেদিনের কথা আজও খুব মনে পড়ে। মা কোথায় থেকে মাছ ধরে এনে অর্ধ-পরিপাকে মুখ উগড়ে আমাকে খাওয়াত।
একদিন মা আমার খাবারের সন্ধানে বাসা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে। অল্প কিছুক্ষণ পর পাড়ার কতগুলো চেঙড়া ছোঁড়ারা গাছের গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে বলাবলি করছে, মনে হয় বাসাটায় বাচ্চা আছে। একজন বলল এখনি গাছে উঠে পেড়ে নিয়ে আসি। বলতে বলতেই চেঙড়াটা গাছে উঠে পড়ে। আমাদের বাসাটা ছিল একটি সরু ডালে। ভেঙে যাওয়ার ভয়ে চেঙড়া ছোঁড়া আমার কাছে পৌঁছাতে না পেরে ডালটা জোর নড়াতে থাকে। আমি পায়ের নখ দিয়ে বাসার খড়কুটো আঁকড়ে ধরে থাকি, আবার কোনোকোনো সময় নিরুপায় হয়ে ঝুলে পড়ি। অবশেষে ধরে রাখার ক্ষমতা আর ধরে রাখতে না পেরে বাসা থাকে বিচ্ছেদ হয়ে জলের উপর পড়ে গেলাম। গাছের গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ছোড়ারা আমাকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়তে লাগলো। আমি তখন প্রাণের ভয়ে জলের উপর ডানা ঝাপটিয়ে ঝাপটিয়ে ওপারে বালিয়াড়িতে উঠে আসি। এমনিতে শীতকাল তার উপর ঠাণ্ডা জলে এতক্ষণ সাঁতার কেটেছি। মনে হচ্ছে সারা শরীর শীতে জমে গেছে। ক্লান্তও হয়েছি বেশ। মৃদু তপ্ত বালি আর মৃদু সূর্যের তাপ গায়ে লাগায় বেশ আরাম বোধ করছি। ধীরেধীরে ক্লান্ত সেরে উঠতেই ওপারে তাকিয়ে দেখি কখনো ফেলে আসা বাসাতে কখনো গাছের মাথায় মাথায়, মা আমাকে হন্যি হয়ে খুজে বেড়াচ্ছে। আমি মাকে সাড়া দিতে চিৎকার করছি, সেই চিৎকার এপার হতে ওপারে মায়ের কাছে কিছুতেই পৌঁছয়না।
এপার থেকে আমি মাকে দেখতে পাচ্ছি, পাগলের মতো খুজে বেড়াচ্ছে। ক্লান্ত হয়ে মা কদম গাছের মাথায় বসে চারিদিক চোখ মেলে খুজতে থাকে।
হঠাৎ চোখ পড়ে গেল আমার দিকে। মা পাগলিনী হয়ে ছুটে এসে বসল আমার কাছে। তখনো মায়ের চোখে জল ছলছল করছে। গলায় গলা পেঁচিয়ে, ঠোটে ঠোট মিলিয়ে কত আদর করল মা আমাকে। সেদিন থেকে বুঝে গেছি সন্তানের প্রতি মায়ের কত মমতা। এরপর থেকে বাসা ছাড়াই মা আমাকে খাইয়ে দাইয়ে বড় করে তুলেছে। বিপদ সম্ভাবনায় মা আমাকে নিয়ে লুকিয়ে পড়তো কাশবনের ভিতর। বীলের জলে ডুবিয়ে ডুবিয়ে মাঝ ধরে খাওয়াত, আমাকে জলে নামতে দিতো না।
কাশবনের ভিতরে মা আর আমি নিরাপদে থাকার মতো জায়গা করেছিলাম। একদিন রাতের বেলায় এক বনবিড়াল হানা দিয়ে মাকে ধরে নিয়ে যায়। কান পেতে শুনি পাশে কোথায় ছটফট শব্দ। বুঝতে পারলাম মা বনবিড়ালের হাত থেকে বাঁচার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। একসময় ছটফট শব্দ বন্ধ হয়ে গেল। সারারাত মায়ের চিন্তায় কেটে গেল। ভোরে উঠে খুঁজাখুঁজি করে পাশে এক জায়গায় খুজে পেলাম বনবিড়ালে খাওয়া মায়ের অবশিষ্ট অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।

Tuesday, 8 November 2016

আশার আলেয়া

আশার আলেয়া

আব্দুল মান্নান মল্লিক

পরিশ্রমের অধিক মূল্য অস্থায়ী। স্বল্প পরিশ্রমের স্বল্প মূল্যই যথেষ্ট। অধিক পরিশ্রমে স্বল্প মূল্যও একদিন পূর্ণতা লাভ করবে। তেমনি স্বল্প পরিশ্রমের অধিক মূল্যের কারণে একদিন সবটাই হারাবে। পরিশ্রম ও মূল্য পাশাপাশি হেঁটে চলে, মনে রেখো।

Wednesday, 5 October 2016

মায়ের ভূমিকা

মায়ের ভূমিকা

আব্দুল মান্নান মল্লিক

বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে , বউ এর নালিশে ছেলে মায়ের গলায় কাটারি বাঁধিয়ে টান দিতেই
মায়ের গলাটা সম্পূর্ণ না কাটলেও বেশ কিছুটা কেটে যায়। অঝরে রক্ত ঝরতে থাকে। মা অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে থানা থেকে পুলিশ এসে ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। গ্রামের লোকজন তার মাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। মায়ের জ্ঞান ফিরতেই শুনতে পাই তার সেই খুনি ছেলেকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে। মায়ের কি কান্না, কেউ আর থামাতে পারেনা।
মা কান্নার সাথে বারবার বলে চলেছে, ওগো, কে আছো তোমরা, শিগগির আমার ছেলেকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসো, আমার ছেলে পুলিশের মার কিছুতেই সহ্য করতে পারবেনা।
( ! আহারে মায়ের প্রাণ। সন্তান যতই অন্যায় করুক, সন্তানের কষ্ট মা কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। আজও কেউ খুজে পাইনি মমতাময়ী মায়ের মমতার গভীরতা। এসো আমরা সবাই  কায়মনোবাক্যে মায়ের প্রার্থনা করি। )

Wednesday, 7 September 2016

প্রত্যাগত দেবীমাতা

আব্দুল মান্নান মল্লিক

সঙ্কট তরিকায় মাগো করেছ দেরি
পড়লো মনে আজ বুঝি বাবার বাড়ি
সামগ্রী উপকরণ যত তোমারি জন্য
তোমার আগমনে মাগো আমরা ধন্য
পদতলে দিও মাগো একটুখানি ঠাঁই
সঙ্কটকালে কর উদ্ধার বড় অসহায়
দশভুজি রণসজ্জায় স্বসস্ত্র বজ্রমুঠে
অবসান কর পাপের পূজিব একনিষ্ঠে
এইটুকু দাবি মোদের তোমার নিকট
অভিযোগ কর গ্রহন হয়োনা বিকট
মুছে দাও গ্লানি যত জাতি ভেদাভেদ
সন্তান তোমারি মানুষ তবুও বিভেদ
সর্বনাশা সবার সাথে অসুরের দল
বিচরণ দিনে-রাতে স্বর্গ মর্ত্য ভূতল
অচ্ছেদনে আজও তারা দৈত্য অসুর
কেন তবে আজ মানুষ অধিক নিষ্ঠুর
নাহি হত ভাগাভাগি হিন্দু মুসলমান
সূচনায় হয়ে যেত অসুরের অবসান
ধীক্কারি যুম্বাসুর বালা জারজ অজম
জন্তু-দানব আলিঙ্গনের বংশ জনম্
কর মাগো আজ তুমি ওদের নিধন
নইলে অনলে দহন হইবে ত্রিভূবণ।
কন্ধরে ধোতি-প্রান্ত করি করজোড়
অস্ত্রাঘাতে কর মাগো অসুর নশ্বর্
আরাধনায় হয়ে যদি অণুমাত্র চ্যুতি
ক্ষমা করে দাও মাগো সেবাতে ত্রুটি

Friday, 19 August 2016

স্মরণীয় দিনটি

স্মরণীয় দিনটি

আব্দুল মান্নান মল্লিক

১৮ই আগস্ট ২০১৬। রাখিবন্ধন উৎসব।
পূর্বপরিকল্পিত ভাবে আমরা ঐতিহ্য গ্রুপের পক্ষ থেকে রাখিবন্ধন উৎসব পালন করতে বেরিছিলাম। খুব সুন্দরভাবে আমরা সফলতা অর্জন করেছি।
সাড়ে চারটে নাগাদ আমরা প্রথমে কৃষ্ণনগর শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রমে পৌঁছয়।
আশ্রমের অনাথ ছেলেরা শ্রীরামকৃষ্ণের নীতি অনুসরণ করে আমাদের সামনে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে, শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী পাঠ করে। আমরা, অর্থাৎ ঐতিহ্য গ্রুপ থেকে অনাথদেরকে খাতা, কলম সম্প্রদান করার পর রাখিবন্ধন কার্য সম্পূর্ণ করি।
এরপর আমরা গেলাম হরিশপুর মা সারদা শিশুকন্যা তীর্থে। আনুমানিক ৩০০ অনাথ শিশুকন্যা শৃঙ্খলাবদ্ধে পথ চেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের অপেক্ষায়।
জানিনা তাদের অতীত ইতিহাস, তবুও হৃদয়ের কোনো এক গভীর কোণে এই অনাথদের অতীত কল্পনার ছাপ পড়ে। কষ্টে অশ্রুকে সংবরণ করে হাসি মুখে তাদের সঙ্গে সহৃদয়তা প্রকাশ করি।
তাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনার পরে সব স্বাভাবিক হয়ে যায়।
এরপর আমরা রাখি বন্ধনের কাজ শুরু করি। শিশুকন্যাদের প্রত্যেককে খাতা কলম ও চকলেট দেওয়ার পরে রাখি বন্ধন কার্য সম্পূর্ণ হয়। প্রত্যেকের মুখে হাসি দেখতে পেয়ে, আমরা নিজেকেও খুশি রাখতে পেরেছি।
এখানকার সমস্ত কিছু সফলতার সাথে সম্পূর্ণ করার পরে, আমরা বেরিয়ে পড়ি শিবরাম মেমোরিয়াল বৃদ্ধাশ্রমের উদ্দেশ্যে।
যথাসময়ে বৃদ্ধাশ্রমে পৌছেছিলাম। দেখতে পেলাম জনা দশেক বৃদ্ধা মায়েদের। কেউবা বিষণ্ণতায় কেউবা রসিকতায়। মনে হল এই মায়েরা একে অপরের সুখ-দুঃখ বিনিময় করে মানসিক সমতা বজাই রেখেই জীবন ধারণ করে আসছেন। সবার সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত হলাম।
আমাদের ঐতিহ্যের পক্ষ থেকে রবীন্দ্র সংগীত, নাচ ও কবিতা আবৃতির মধ্য দিয়ে যতটা সম্ভব মায়েদেরকে আনন্দ দান করেছি ও সফলতার সাথে রাখি বন্ধনের কাজ সম্পূর্ণ করে এখানেই আমাদের কর্মসূচি সমাপ্তি করেছি।



Wednesday, 10 August 2016

হৃদয়ের ব্যক্ত কথা

 হৃদয়ের ব্যক্ত কথা

আব্দুল মান্নান মল্লিক

১ / পরিবেশ মানুষকে বদলাই না, মানুষ পরিবেশকে বদলাই।
২ / খুশির খবরে আনন্দের সীমা ছাড়ানো মানে দুঃখ আসন্ন।
৩ / পরিশ্রমের অধিক আশা করা, মানে অমঙ্গলকে আহ্বান করা।
৪ / সমাজকে কলুষিত করা, পরবর্তী প্রজন্মকে আগুনে ঠেলে দেওয়া সমান।
৫ / অপরের দুর্দিনে তৃপ্তি অনুভব, মানে নিজের চলতি পথে কাঁটা বিছানো।
৬ / অন্যের সমৃদ্ধিতে ঈর্ষান্বিত হওয়া, মানে অগ্নি সংযোগে নিজেকে জ্বালানো।



সারা জগৎ ঘুরে মর সুখ যে কোথায় আছে,
নিজের মনে সুখের খবর সুখ কি ধরে গাছে?

Sunday, 3 July 2016

লেখক ও পাঠক পাঠিকা

লেখক ও পাঠক পাঠিকা

আব্দুল মান্নান মল্লিক

গাছ মাটিতে পুতে দেওয়া খুবই সহজ কিন্তু, বাঁচিয়ে রাখাটা খুবই কঠিন।
তেমনি লিখালিখি যতটা সহজ, বাঁচিয়ে রাখাটা খুবই কঠিন। বাঁচিয়ে রাখতে পারে একমাত্র পাঠক পাঠিকা।

Saturday, 7 May 2016

ফুল ফুটলেই—গাছ চেনা যায়

ফুল ফুটলেই—গাছ চেনা যায় 

আব্দুল মান্নান মল্লিক

বেশ অনেকদিন আগের কথা, বয়স তখন আমার  বত্রিশ, কি পঁয়ত্রিশ হবে হয়তো। 
একটা বিশেষ কাজের জন্য কলকাতা বেরিয়েছি।
ট্রেনে উঠে সুবিধা মতো বসার জায়গা খুজছি।
জানালার ধারে বসে আছে এক বৃদ্ধ ভদ্রলোক । বয়স -- আনুমানিক বাষট্টি কি পঁয়ষট্টি।
ভদ্রলোকের পাশে একজনের বসার মতো জায়গা খালি পড়ে আছে। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখি বসার মতো আর কেউ ছিলনা, তাই আমি নিজেই বসে পড়লাম।
নিজের এলাকার বাইরে খুব বেশি চলাফেরার অভ্যাস আমার ছিলনা, তাই একটু সঙ্কোচ বোধে জড়সড় হয়ে বসেছি। বৃদ্ধ লোকটি আমাকে উদ্দেশ্য করে বললেন ভালভাবে বসো। ভদ্র লোকটির কথা শুনে একটু গা ছেড়ে বসলাম। এমনিতে আমি গেঁয়ো, তাছাড়া অচেনা যাত্রীর ভিড়ে নিজেকে কেমন যেন লজ্জিত ও বোকাবোকা মনে হচ্ছিলো।
মাথার মধ্যে ঘুরঘুর করতে লাগলো ভদ্রলোকটির চশমার কথা। দেখলাম কাঁচ বিহীন একটা তারের ফ্রেম মাত্র। ভাবলাম বয়স্ক লোক, চশমার প্রয়োজন না হলেও নিজের দৃশ্য সভ্য বজায় রাখতেই শুধুমাত্র তারের ফ্রেমটাই ব্যাবহার করছেন। ভাবতে ভাবতে দেখি তারের ফ্রেমটা খুলে ভদ্রলোক ধুতির আঁচল দিয়ে চশমার কাঁচটা পরিষ্কার করে আবার নাকের উপর বসিয়ে নিলেন। তখন বুঝতে পারি, যেটা ভাবছিলাম তা নয়। বেশ মর্যাদাশালী ব্যক্তি, চশমাটিও বেশ দামি।
চানাচুরওয়ালাকে ডাক দিয়ে বললেন, দু প্যাকেট গেঞ্জি রায়ের চানাচুর দিয়ে যা। অনেকদিনের পুরানো কথা, তাই ভালো মনে পড়েনা চানাচুরের নামটা। তবে গেঞ্জি রায়, এঞ্জি রায়, নাহলে এন জি রায়, এই তিনটের মধ্যে একটা অবশ্যই হবে। আমার অনিচ্ছা সত্ত্বেও ভদ্রলোক একটা প্যাকেট ধরিয়ে দিয়ে বললেন খাও খাও, এটা ট্রেনের নামকরা চানাচুর। বাইরে কোনো দোকানে পাওয়া যায়না।
অগত্যা খেতে শুরু করেছি। দুজনে চানাচুর খেতে খেতে একথা সেকথার মধ্যে দিয়ে আমাদের সম্পর্কটা খুব কাছাকাছি হয়ে গেল। বৃদ্ধ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কোথায় যাচ্ছ?
আমি বললাম কলকাতা বড়বাজার যাবো।
বৃদ্ধ বললেন বাঃ, ভালোই হল। আমারও বড়বাজারের কজটা সেরে তারপর হাওড়া যাবো। বড়বাজার পর্যন্ত এক সঙ্গে যাওয়া যাবে। কথায় কথায় এক সময় ট্রেন শিয়ালদহ স্টেশনে পৌছে গেল।
ট্রেন থেকে নেমে হাতে মুখে জল দিয়ে, ফ্যানের নিচে মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে, দুজনে আবার হাঁটতে শুরু করেছি। বড় বাজারের কাছাকাছি পৌঁছতেই দেখি রাস্তার ধারে বেশ কিছু মানুষ ভিড় জমিয়ে হৈ-চৈ করছে।
বৃদ্ধ বললেন তুমি একটু দাঁড়াও ব্যাপারটা একটু বুঝে আসি। বৃদ্ধের ফিরতে দেরি হচ্ছে দেখে, আমিও মানুষের ভিড় ঠেলে গলা বাড়িয়ে দেখি, যে যেমন পারছে একজনকে কিল ঘুসি মারছে।
আরও দেখলাম, ওই বৃদ্ধ ভদ্রলোকটিও দুই ঘুসি মেরে বেরিয়ে আসলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ওখানে দেখলাম, একজনকে যে যেমন খুশী মারছে! ওই লোকটি এমন কি করেছে? 
জবাবে ভদ্রলোক বললেন, আমিও ঠিক বুঝলাম না।
আবার জিজ্ঞেস করি, আপনিও মারলেন যে?
ভদ্রলোক বললেন, কি জানি কি ব্যাপার, সবাই মারছে দেখে আমিও দু-ঘুসি লাগিয়ে দিলাম।



Sunday, 13 March 2016

√ শুধু আমরা চারজন

শুধু আমরা চারজন(প্রাপ্তি প্রকাশিত)

আব্দুল মান্নান মল্লিক

আমাদের গ্রামের নাম মরাদিঘি। ছোট্ট একটি গ্রাম। গ্রামের পশ্চিম দিকে পাকা রাস্তা। পাকা রাস্তা পেরিয়ে বিশাল গঙ্গার বাঁধ। বাঁধের ওপারের ঢালে কাশবনে ভরা। কাশবন ভেঙে বালুচর, তারপর ছাড় গঙ্গা। এই ছাড় গঙ্গা আমাদের এখানে বাঁওড় নামে পরিচিত। এই বাঁওড় ও গঙ্গার মাঝখানে একটি দ্বীপ। এই দ্বীপটির নাম শাঁখদহ। শাল, সেগুন, শিশু, মেহগানি আরও বিভিন্ন প্রকার বড়বড় গাছে ভর্তি এই দ্বীপটি। গাছগুলো পাকা রাস্তার ধার থেকে ভালভাবে দেখা যায়। সন্ধ্যার সময় বড়বড় গাছগুলো ঢেকে যায় বিভিন্ন রকম বড়বড় পাখিদের ছাউনিতে। দূর থেকে দেখে মনে হয়, ঈশ্বরের কি অপূর্ব বৈচিত্রপূর্ণ দান। ঈশ্বরের কাছে পাখিরা হয়তো চেয়ে নিয়েছে তাদের নিজের অধিকার। তাই ওরা স্বাধীন ভাবে নিজের এলাকা ভাগ করে নিয়েছে।
দূর থেকে দেখতাম আর ভাবতাম, এতো সুন্দর জায়গা, কোনোদিন যদি কাছ থেকে দেখতে পেতাম কতো না ভালো হতো!
ইং - ১৯৭৮ সাল, মার্চ মাসের শেষের দিকে
মাধ্যমিক পরিক্ষার পর সামনে লম্বা অবসর সময়। কাগজ কলমে না হলেও গরমকাল বলা যায়।
অনেকদিনের অপেক্ষায় থাকা এই লম্বা সময়টা। নাই কোনো পড়াশুনার চাপ, নাই কোনো বাবা মায়ের বকুনি। নিজেকে মনে হল, আমি যেন এক মেঘবিহীন মুক্ত আকাশের মুক্ত পাখি।
একদিন আমরা চার বন্ধু মিলে মনস্থির করলাম, তিনদিনের মতো বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবো শাঁখদহ দ্বীপ দেখতে। একদিন একদিন দুদিন যাওয়া আসা, আর মাঝে একদিন থেকে যাবো, এই নিয়ে তিনদিনের কর্মসূচি। তাহলে ঘুরেঘুরে ভালভাবে সবটা দেখতে পাবো।
বাড়িতে বলতেই প্রথমে অমত করলেও পরে রাজি হয়ে যায়।
ইমাম , দীপু ও জুব্বার, এই তিন জন ছিল আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু।
আমাদের চার বন্ধুর মধ্যে, ইমাম ছিল অত্যন্ত সাহসী। গায়ে শক্তিও ছিল প্রচন্ড। বেশ সাফাই-এর সাথে বিষধর সাপও ধরতে দেখছি এই ইমামকে।
ইমামের মতো সাহসী বন্ধুকে সঙ্গী পেয়ে মনের জোর অনেক বেড়ে গেল।
দিনটা ছিল বুধবার। দুপুরের পরে চার বন্ধু মিলে চারটে ব্যাগ ভর্তি তিনদিনের মতো থাকা খাওয়ার সরঞ্জাম গুছিয়ে নিয়ে, ভাড়ার গাড়ি এম্বাসেডর-এ উঠে বসলাম। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যে গাড়ি ছেড়ে দিলো। গ্রাম সোজাসুজি বাঁধ পেরিয়ে কাশবন ভেঙে যাওয়া বেশ কষ্টকর, কিছুটা দূর হলেও ড্রাইভার ঘুরপাক রাস্তা ধরে আমাদেরকে দাদপুর ঘাটে নামিয়ে দিলো।
এখানে পারাপারের কোনো নৌকো থাকে না। জেলেরা ছোটোখাটো নৌকো নিয়ে ফাঁসি জাল পেতে মাছ ধরে। ওদেরকে বলে কেউ কেউ দু-চার টাকা দিয়ে সময়ে যাওয়া আসা করে।
আমাদেরকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে এক জেলে, ছোটো নৌকো নিয়ে এগিয়ে এসে জানতে চাইলো আমরা ওপারে যাব কি না। আমাদের বলার আগেই জেলে বললো, চারজনে পাঁচ টাকা লাগবে। আমরা এক কথাই রাজি হয়ে গেলাম। অবশ্য তখনকার দিনে পাঁচ টাকার মূল্য নিহাত কম ছিলনা।
চারজন চারটে ব্যাগ কাঁধে নিয়ে নৌকোতে চেপে বসলাম। নৌকো ছেড়ে চলতে শুরু করেছে। জুব্বার মুখে খুব বড়বড় কথা বললে কি হবে, আসলে ছিল প্রচন্ড ভীতু। স্রোত বিহীন বাঁওড়ের গম্ভীর জল, ছোটো নৌকোটিও করছে টলমল। এইভাবে কিছুটা যেতে না যেতেই জুব্বার ভয়ে লাফালাফি আরম্ভ করে দিয়েছে। এই বুঝি জলে ঝাঁপ দিবে। আমরা সবাই ওর ব্যাপারস্যাপার দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গেলাম। ভাগ্য ভালো, সঙ্গে ইমাম ছিল। ইমাম জুব্বারকে জোর করে ধরে নিয়ে নৌকোর মাঝে বসলো। যাক এবার অনেকটা সস্তি! তবুও জুব্বার মাঝেমাঝে ঝুঁকি মারে নিজেকে ছাড়িয়ে নিতে। তখনো জুব্বার ভয়ে কাঁপছে। নিরুপায় হয়ে বেচারা আল্লাহ আল্লাহ করে চিৎকার করতে লাগলো। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর অবস্থা দেখে ভয় পেয়ে গেল দীপুও। এ-ও ভগবান ভগবান শুরু করে দিল। তবে জুব্বারের মতো দীপু লাফালাফি করেনি। যায় হোক এই সঙ্কটের মধ্যে দিয়ে এক সময় দ্বীপের কিনারায় নৌকো ভীড়ে গেল। যে যার মতো দ্বীপে নেমে পড়লাম। এই সেই শাঁখদহ দ্বীপ। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখি, চারটে বেজে গেছে।
সামনে একটা প্রকাণ্ড শিশু গাছ। গাছে নতুন সবুজ পাতা, শিকড় গুলো সব মাটি ছাড়া উঁচু-উঁচু হয়ে জেগে আছে। মাটিতে পা রেখে শিকড়ের উপর বেশ আরামের সাথে বসা যায়। গাছের ছায়ায় শিকড়ের উপর বসে বিশ্রাম নিতেই দীপু মনের আনন্দে গান ধরেছে। হঠাৎ করে দীপু গানের সুর ছেড়ে দিয়ে, ব্যা-ব্যা করতে করতে দূরে পালিয়ে যায়। ওখান থেকে গাছের দিকে আঙুল দেখিয়ে সা-সা-সা, প-প-প করে আমাদেরকে কি বোঝাতে চাচ্ছে ঠিক বুঝে উঠতে পারছিনা। গাছের উপর তাকিয়ে দেখি, দীপুর বসে থাকা মাথার উপরে কাছাকাছি একটি সরু ডালে সবুজ রঙের একটি লম্বা সাপ লেজটা পেঁচিয়ে ধরে ঝুলছে। পাতার রঙে রঙ, তাই ভালো বোঝা যাচ্ছেনা।
জুব্বার বললো, ও" ওর মতো থাক, চল আমরা ওদিকে এগিয়ে যায়।
আমরা হাঁটতে শুরু করলাম, আঃ, চারিদিকে তাকাতেই চক্ষু জুড়িয়ে গেলো। বিশাল বড় বড় গাছ গুলো আকাশ ছুঁয়ে দাঁড়িয়ে যেন আমাদের শুভাগমন জানাচ্ছে। বাঁওড়ের জলাধারের কিছুটা দূরে, তাঁবু খাটিয়ে ভিতরে বড় চাদর বিছিয়ে বেশ বসবাসের উপযোগী জায়গা করে নিয়েছি। সূর্য মামা ঢলে পড়েছে পশ্চিম আকাশের শেষ প্রান্তে। ক্রমে ক্রমে অন্ধকার নেমে আসে। ততক্ষণে দীপু কেরোসিন বাতি জ্বালানোর কাজটা সেরে রেখেছে।
অন্ধকারে বাতির কাছ ছাড়া আর কিছু দেখা যায়না।
বাতিটা তাঁবুর সামনে রেখে আমরা ভিতরে গল্প শুরু করেছি। জুব্বারকে নিয়ে বেশ হাসিঠাট্টা শুরু করে দিয়েছি।
এইভাবে প্রায় ঘণ্টা দুয়েক কেটে যাওয়ার পর, ইমাম বাইরে বেরিয়ে গেল। আমি ভিতর থেকেই ইমামকে তাঁবুর ভিতরে আসতে বললাম।
ইমাম আসছি বলে কিছুক্ষণ পরে আমাদেরকে বেরিয়ে আসতে বললো।
আমরা সবাই ভয় পেয়ে আতঙ্কিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করি কেন কি হলোরে?
ইমাম বললো, কতো সুন্দর দৃশ্য, বাইরে বেরিয়ে এসে একবার দেখে যা।
সবাই বাইরে বেরিয়ে দেখি চাঁদের প্রথম আলো কেবলে ফুটছে। পশুপাখিদের মাঝে শুধু আমরা চারজন। শুবিধা মতো গাছের ফাঁকে দাঁড়িয়ে চাঁদ ওঠা দেখছি আর মনে মনে ভাবছি!
হে প্রভু, তুমি চলো তোমার পথে,
কেউ দেখুক বা নাইবা দেখুক
তোমার কি আসে যায় তাতে।
সদ্যজন্মিত চাঁদের সৌন্দর্য ভাবতে ভাবতে একসময় চোখ দিয়ে জল গড়ে পড়লো, সবই তোমার মহিমা প্রভু! এই নির্জন দ্বীপকেও তুমি শোভিত করে রেখেছ?
ধীরেধীরে রূপশ্রী স্বর্ণবিন্দু উপরে উঠে গেল। গাছের ফাঁক দিয়ে স্বর্ণ জ্যোতি প্রবেশ করছে। রাতের বেলায় কষ্ট হলেও অস্পষ্টে জমিনের সবকিছু দেখা যাচ্ছে। আমরা তাঁবুর কাছে আবার ফিরে আসি।
আমি সবাইকে ডেকে নিয়ে ভিতরে বসলাম।
একদিনের মতো বাড়ি থেকে নিয়ে আসা শুকনো খাবার, যে যা এনেছিলাম সব একইসঙ্গে মিশিয়ে রাতের খাওয়াটা ওতেই মিটিয়ে ফেললাম।
গল্পগুজব, এদিক সেদিক করতে করতে যখন রাত্রি সাড়ে বারোটা বাজে, সবাইকে শুয়ে পড়তে বললাম। কে কার কথা শুনে।
দীপু বললো দুদিনের মত ঘুরতে এসে ঘুমিয়ে কাটাবো নাকি?
জুব্বার বললো ঘমন্ত অবস্থায় যদি তাঁবুর মধ্যে সাপ বেঙ কিছু একটা ঢুকে পড়ে? তার চেয়ে জেগে থাকায় ভালো।
ওদের দুজনের কারও কথাই ফেলতে পাড়লাম না। কি আর করি, অবশেষে বললাম, তোরা যেটা ভালো বুঝিস, বলে তাঁবুর এক কোণে আমি শুয়ে পড়লাম।
অনেক সময় অপেক্ষার পরে, চোখটা একটু এঁটে আসতেই জুব্বারের চিৎকার চেঁচামেচি শুনে ধড়পড় করে উঠে পড়ি। তখনও জুব্বার চিৎকারে বলে চলেছে, ধরেছে ধরেছে, বাঁচাও বাঁচাও! ইমাম চিৎকার করছে, ভয় নাই, জুব্বার ভয় নাই, আমি এসে গেছি। তখনও জুব্বার চিৎকার করেই চলেছে। ততক্ষণে আমরা সবাই জুব্বারের কাছে হাজির। আমি বললাম কই কিসে ধরেছে? কিছুই তো দেখতে পাচ্ছিনা। দীপু জুব্বারের পিছনে গিয়ে দেখে, শিমুল গাছে জড়িয়ে ওঠা একটা কাঁটা গাছের লতায় জুব্বারের জামা আটকে আছে।
কি আর বলবো এই জুব্বারকে। ভাবলাম দুই চড় লাগিয়ে দিই, কিন্তু মারবো কি করে, হাসি আর থামতে চাইনা।
যায় হোক, রাত্রিটা এইভাবে কেটে গেল প্রায়। আনুমানিক চারটে বাজে। তখনো অন্ধকার সম্পূর্ণ কাটেনি।
আমরা চলে গেলাম বাঁওড়ের জলে হাত মুখ ধুতে ও বোতলে জল ভরে আনতে।  ফিরে এসে দীপুকে চটপট চা বানাতে বললাম, দীপু কাঠখড়ি পুড়িয়ে তাড়াতাড়ি চা বানিয়ে হাতে দিতেই, ইমাম মশলা মুড়ি মাখিয়ে হাজির। আমরা চা-মুড়ি খেতে শুরু  করেছি। ঠিক এমন সময় গাছে গাছে পাখিদের হৈ-চৈ শুরু হয়ে গেল। গাছ ছেড়ে যে যার মতো উড়ে কোথায় চলে যাচ্ছে। সকাল হতে আর অল্প কিছু সময় বাকী আছে, আকাশ একটু পরিষ্কার হতেই সূর্য ওঠার আগে গাছগুলো পরিষ্কার হয়ে গেল।
কিছুক্ষণ পরে দেখতে পেলাম গাছের মাথায় মাথায় ঝিকিমিকি রোদ। অপূর্ব দৃশ্য, দু-একটা এড়ানো পাখি তখনো উড়ে যাচ্ছে গাছ ছেড়ে।
আমরা তাঁবু গুটিয়ে নিয়ে ঠিক হাঘরে বেশে চলে গেলাম বাঁওড়ের ধার, সকালের দৃশ্য দেখতে।
কি মনোরম দৃশ্য। বুনোহাঁসের ঝাঁক জলের উপর দিয়ে সাঁতার কাটছে। কখনো একে অপরকে ডানার ঝপটায় তাড়া করছে। ধারে ধারে চরে বেড়াচ্ছে শামুকখোল আর বড় আকৃতির সারস পাখি। মাথার উপর দিয়ে কত পাখির আনাগোনা। তীক্ষ্ণ থেকে শুরু করে কর্কশ কণ্ঠস্বর বিভিন্ন পাখির বিভিন্ন ডাক। দেখে মনে হচ্ছে আজ হয়ত পাখিদের কোনো বড় ধরণের সমাবেশ আছে।
বাঁওড়ের ধার বরাবর গল্প করতে করতে হাটতে থাকি। চরের উপরে বুনোহাঁসের টাটকা ডিম ও পড়ে আছে। হয়ত ডিম পাড়ার উপযুক্ত সময়ে বাসা  বাঁধতে না পারা বুনো হাঁস ওখানেই ডিম পেড়ে আবার জলে নেমেছে। দীপু ও জুব্বার মনের আনন্দে অনেকগুলো ডিম কুড়িয়ে ব্যাগে পুরে নিয়েছে।
উপরে গহন কাশবন। কাশবনের গা ঘেঁষে কোথাও কোথাও বুনো হাঁস বাসায় বসে ডিমে তা দিচ্ছে। আবার কেউ সাথে করে সদ্যজাত বাচ্চা নিয়ে বেড়াচ্ছে। প্রকৃতির সাজানো এই মনোহর দৃশ্য দেখতে কার না ভালো লাগে!
তাইতো ভাবি!
সর্বত্রই তুমি মহান প্রভু,
সচরাচর বিদ্যমান।
যতকিছু আছে যেথায়,
তাদের ও দিয়েছ প্রাণ।
শুকনো ছোলার ছাতু আর আঁখের গুড় ভর্তি একটা টিফিন বাক্স, ইমাম তার ব্যাগ থেকে বার করে বাঁওড়ের জলে ভালো করে ভিজিয়ে নিল। বেশ খিদে পেয়েছিল আমাদের। চারজনে বেশ তৃপ্তি করে খেলাম।
তারপর আমরা কাশবন ভেঙে আবার দ্বীপের উপর উঠে আসি।
গাছের ছায়ায় কিছুক্ষণ বিশ্রাম নেওয়ার পর আবার চলতে শুরু করি।
দ্বীপের ভিতর দিকে যেতেই দেখি, আরও অনেক চেনা ওচেনা বড়বড় গাছ মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে। স্থানীয় পাখিগুলো গাছ ছেড়ে উড়ে যাচ্ছে, আবার কেউ কেউ ভিজা পালকে উড়ে এসে ডানা ছড়িয়ে গাছে বসে, রোদে শুকিয়ে নিচ্ছে।
এই সব দৃশ্য দেখতে দেখতে আর গল্প করতে করতে আমরা এগিয়ে চলেছি। কথায় কথায় ইমাম বললো, সত্যিই বেড়াবার মতো একটা জায়গা বটে। তবে বিষধর সাপ-টাপ থেকে আমাদেরকে একটু সাবধানে থাকতে হবে। মাঝে মাঝে ধেড়ে ইঁদুর দেখা যাচ্ছে। আরও আছে বনবিড়াল আর শিয়াল। তবে আমরা নিশ্চিত এখানে কোনো হিংস্র বাঘ ভাল্লুক নাই। ইমামের কথা শেষ হতে না হতেই বাঘ ভাল্লুকের কথা শুনে জুব্বার আবার ভয় পেয়ে চিৎকার চেঁচামিচি করতে লাগলো। ইমামকে জড়িয়ে ধরে আর কিছুতেই ছাড়তে চায় না।
যা হয় করে আমরা ওকে অনেক বঝিয়ে সুঝিয়ে স্বাভাবিকে ফিরিয়ে আনি। সূর্য তখন বেশ কিছুটা উপরে উঠে এসেছে। কোথাও কোথাও ফাঁকা জায়গায় সবুজ কচি ঘাসের উপর রোদ পড়েছে। আমরা গাছের ছায়া ধরে চলতে থাকি। আগাছার অনাদরে ফুলগুলো সুন্দর হয়ে ফুটে আছে। প্রজাপতিরা আঁকাবাঁকা পথ ধরে ফুলে ফুলে উড়ে বেড়াচ্ছে। কি মনোহর দৃশ্য! বাঁওড়ের উপর দিয়ে বয়ে আসা শীতেল মৃদু বাতাস আমাদের গা ছুঁয়ে ছুঁয়ে চলে যায়। আঃ! প্রাণটা একেবারে জুড়িয়ে যায়!
প্রভু হে সদয় মহান,
লালনে পালনে করেছ শোভিত
জনবহুল বা নির্জন স্থান।
এইভাবে যতই এগিয়ে যায় ততই অত্যাশ্চর্য বাড়তেই থাকে। এক সময় আমরা শাঁখদহ দ্বীপের সব চেয়ে উঁচু জায়গাটিতে উপস্থিত হলাম।
গাছে গাছে প্রচুর পাখির বাসা। কেউ বাসায় বসে ডিমে তা দিচ্ছে, আবার কেউ উড়ে এসে বাচ্চাদের খাবার খাইয়ে আবার উড়ে যাচ্ছে। নিচ থেকে বেশ ভালোভাবে শুনা যাচ্ছে কেঁ-কেঁ, চিঁ-চিঁ বাচ্চা পাখির ডাক। গাছতলার ঘাস ও আগাছা-গুলো পাখির বিষ্ঠার উপর বিষ্ঠা পড়ে এমনভাবে ঢাকা পড়েছে চেনার কোনো উপায় নাই। পাখি-পাখি একরকম ভস্কা বিষ্ঠার গন্ধ নাকে প্রবেশ করছে। আমরা ভাল করে নাকে গামছা জড়িয়ে নিলাম। জায়গাটা খুব একটা সুবিধা বলে মনে হয় না। কেমন যেন একটা গা শিহরণী ভয়-ভয় মনে হয়। মাঝেমাঝে শিয়াল ও বনবিড়াল আমাদের সাড়া পেয়ে ছুটে পালাচ্ছে। জুব্বার সব সময় সারিতে মাঝে থাকতে চায়।
অনেক ক্লান্তির পর একটু বিশ্রাম নিতে দাড়িয়েছি।
ইমাম গাছের একটি ডাল ভেঙে লাঠির মতো হাতে নিয়ে এদিক-ওদিক ঘুরতে থাকে। কিছুদূর এগিয়ে যেতেই চমকে উঠে পিছিয়ে আসে। জিজ্ঞেস করি, কিরে ইমাম অমন করে চমকে উঠলি কেন? ইমাম মুখে কোনো কথা না বলে, হাতের ইশারা দিয়ে কাছে যেতে বলছে।
আমরা ধীর পায়ে এগিয়ে যেতেই ইমাম আঙুল দেখিয়ে বললো ওই দেখ! তাকাতেই ভয়ঙ্কর কাণ্ড। বিষধর গোখরো সাপ, আর বেজির লড়াই। কেউ হার মানতে চাইনা। উভয়ের রাগ বেড়েই চলেছে। সাপ ফোঁস করে ছোবল মারছে আর বেজি দ্রুত সরে যাচ্ছে। সাপের ছোবল সব বিফলে যাচ্ছে।
সাপ বেজির লড়াই আজ জীবনের প্রথম দেখা। তাই বেশ মজাই লাগছে। জুব্বার তো ভয়ে দীপুর গায়ে একেবারে সেঁটে লেগেছে।
ইমাম বললো মান্নান, একবার হুকুম দে-না, সাপটাকে ধরে--- ইমামের কথা শেষ হতে না হতে আমি একটা জোরসে ধমক দিয়ে বললাম, তুই একটা পাগল। বেশী বেশী ওস্তাদগিরি ভালো নয়। শুনে ইমাম চুপ করে গেল।
কোথা হতে এক ওত পেতে থাকা ঈগল ঝপাং করে সাপটির উপর পড়ে সাপটিকে তুলে নিয়ে চলে গেল। বেজিটা তখন আগাছা ঝড়ের মধ্যে দিয়ে পালিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ নির্বাকে থাকার পর জুব্বার বললো আর বেশিদূর যেতে হবে না। আবার আমাদেরকে ফিরে যেতে হবে সেই বাঁওড়ের ধার। দীপু বললো ফিরতে এমন কিছু বেশি সময় লাগবেনা। আমরা চারিদিক দেখতে দেখতে এসেছি তাই সময় অনেক বেশি লেগেছে। আর কিছুটা এগোলেই গঙ্গাটাও একবার দেখে আসতে পারবো।
আমি বললাম ফিরে যাওয়াটায় ভালো, আবার পরে কোনো সময় আর একবার এসে সবটা ভালো করে দেখবো। ইমাম আমার কথায় সাঁই দিয়ে বললো, সেই ভালো।
ওখান থেকে আমরা ঘুরে হাঁটতে শুরু করি। একটানা হেঁটে আসায় তাড়াতাড়ি পৌছে গেলাম একেবারে বাঁওড়ের ধার। বাঁওড়ের জলে চারজনে ভালোমতো স্নান করে, চারটে বড় বোতলে খাওয়ার জলও ভরে নিয়েছি।
ক্লান্ত শরীর শীতেল জলে স্নান করে উঠতেই শরীর ও মন আবার নতুন সতেজ হয়ে উঠলো।  এবার আমরা দ্বীপের আরও একটু ভিতর দিকে কিছুটা ফাঁকা জায়গা বুঝে সবুজ ঘাসের উপর তাঁবু খাটিয়ে ফেলেছি, যাতে আগের দিনের মতো তাঁবুর উপরে পাখির বিষ্ঠা না পড়ে। তাড়াতাড়ি করে রান্নার কাজটাও সেরে ফেললাম।
দীপু আর জুব্বার চারটে আসন নিয়ে তাঁবুর বাইরে পেতে দিয়ে বললো, আর থাকা যায়না।
কখন ছোলার ছাতু খেয়ে বেরিয়েছি, বেলা দুটো গড়িয়ে গেল।
চারজনে একসঙ্গে খেতে বসে গেলাম। কুড়িয়ে পাওয়া বুনোহাঁসের ডিম দিয়ে আলুর ঝল, ওঃ, দারুণ লাগলো! বাড়িতে রকমারি খাবার হলেও এখানকার খাবারের স্বাদই আলাদা।
খাওয়ার পরে তাঁবুর মধ্যে সবাই একটু সময় গা গড়া দিয়ে আবার উঠে বসি। সাড়ে তিনটে বেজে গেল, চরতে যাওয়া পাখিদের ফিরে আসার অপেক্ষায় আমরা সবাই ব্যাকুলিত হয়ে বসে পড়ি। কারণ আগের দিন ঠিক সময়মত পৌছাতে পারিনি।
সময় বয়ে যায়। অল্প কিছুক্ষণ পরেই চরতে যাওয়া পাখিগুলো যে যার মতো ফিরে আসতে শুরু করেছে নিজের এলাকায়। ছোটো থেকে বড়, রংবেরঙের বিভিন্ন প্রকার পাখিদের ভীড় জমে গেল গাছের মাথায় মাথায়। কে কার উপরে বসছে তার ঠিকঠিকানা নাই। কিছুক্ষণের মধ্যেই আবার সাইজ হয়ে ঠিক জায়গা মত বসে যাচ্ছে। বিভিন্ন প্রজাতির বড়বড় পাখিদের বিভিন্ন রকম ডাক। দেখে মনে হচ্ছে পাখিদের মেলা বসেছে। বিরামহীন একটানা কলরব। পাখিদের সাথে মজা উপভোগ করতে করতে অনেক রাত্রি হয়ে গেল। সময় বুঝে দীপু ও জুব্বার রান্নার কাজটা সেরে ফেলেছে। আমি সবাইকে বললাম চল অনেক হয়ে গেছে, খেয়েদেয়ে এবার শুয়ে পড়ি।
সারাদিনের ঘুরাঘুরিতে সবাই ক্লান্ত, তাই কেউ আর দ্বিধাবোধ করল না। সবাই খেয়েদেয়ে তাঁবুর ভিতরে শুয়ে পড়লাম।
পরেরদিন ঘুম ভাঙতেই দেখি সূর্য বেশ উপরে উঠে এসেছে। তাড়াতাড়ি চা-মুড়ি খেয়ে এবার বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হলাম। হাটতে হাঁটতে আমরা পৌছে গেলাম বাঁওড়ের ধার। আসার সময় যেখানে নেমেছিলাম ঠিক সেখানেই পৌছে গেছি। এক জেলে নোকো নিয়ে ফাঁস জাল পাততে পাততে এদিকেই এগিয়ে আসছে। আমরা জিজ্ঞেস করলাম এই যে জেলে ভাই, আমাদেরকে পার করে দিবে? জেলে বললো হাঁ ভাই, আর একটা জাল আছে এটা পাতা হলেই তোমাদের পার করে দিব। ডাঙার কাছাকাছি আসতেই জেলে হঠাৎ চিৎকার কার করে উঠলো। আমরা দেখতে পাচ্ছি জলের তলায় কেউ যেন জেলেকে ধরে টানাটানি করেছে, জেলেও প্রাণপণ ডাঙায় উঠতে চেষ্টা করছে, শক্তিতে পেরে উঠছে না। ধীরেধীরে কে যেন জলের মাঝে টেনে নিয়ে যেতে চেষ্টা করছে। এই অবস্থায় ইমাম আর চুপ থাকতে পারলনা। ব্যাগ হতে একটা ধারালো ছুরি বার করে ইমাম জলে ঝাঁপ দিলো। আমরা অনেক চেষ্টা করেও ইমামকে আটকাতে পারলাম না। জলের তলা হতে কে যেন দুজনের সঙ্গে চরম ধ্বস্তাধস্তি করছে। কিছুক্ষণ পর ইমাম জলে ডুবে গেল। আমরা ডাঙাতে চিৎকার চেঁচামেচি করি। নির্জন এই দ্বীপে আমাদের চিকারের আওয়াজ কারও কানে পৌছাল না। আমাদের চোখের সামনে কিসে যেন ইমামকে তলিয়ে নিয়ে চলে গেল। ইমাম আর হয়তো বেঁচে নাই। ভাবতে ভাবতে ইমাম দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জলের উপর ভেসে উঠে সাঁতার কাটতে থাকে। ক্লান্ত হয়ে দুজনেই কাছে আসলে আমরা হাত ধরে ডাঙায় তুলে নিলাম। কিছুক্ষণ বিশ্রামের পর সবাই নৌকোতে উঠে বসলাম। জেলে ঝোঁক সামলিয়ে নৌকো ছেড়ে দিল। জুব্বার ভয় পেয়ে নৌকোর মাঝখানে চুপচাপ বসে রইলো। নৌকো চলতে চলতে যখন ইমামকে জিজ্ঞেস করি, ইমাম বললো রবারের দড়ির মতো কি যেন জেলের একটা পা পেঁচিয়ে ধরে টানাটানি করছিল। আমার ধারালো ছুরি দিয়ে ওটাকে কেটে দিতেই জেলেকে ছেড়ে দিয়েছে। জেলে বললো এইতো মাত্র তিনদিন আগে, একজনকে জলের তলে কিসে টেনে নিয়ে গেছে। অনেক খুঁজাখুঁজি করেও তাকে পাওয়া যায়নি।
প্রতি বছরই এমন দু-চারটে ঘটতেই থাকে। ভাগ্যক্রমে তোমরা এসেছিলে তাই আমি বেঁচে গেছি। কথা বলতে বলতে নৌকো দাদপুর ঘাটে ভিড়ে গেল। নৌকো থেকে নেমে জেলেকে ভাড়া দিতে চাইলে কিছুতেই নিল না।
এম্বাসেডরের ড্রাইভার কথামতো আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিল। এম্বাসেডরে চেপে আমরা বাড়িতে পৌছে গেলাম।
পরের দিন সকালবেলায় মানুষের মুখেমুখে শুনতে পাই, বাঁওড়ের ঘাটে, এক কুইন্টাল ওজনের একটি মরা শামুক ভেসে উঠেছে। শামুকটির দুটো শুঁড়ের একটি শুঁড় কাটা।
সমাপ্ত

Friday, 26 February 2016

কিছু বিলাপ কথা

কিছু বিলাপ কথা

আব্দুল মান্নান মল্লিক

মাঝপথে দাঁড়িয়ে পথ অবরোধ না করে, নিজে চলুন ও অপরকে চলতে সহযোগীতা করুন।
নিজে ভালো কিছু করার চেষ্টা করুন। দেখবেন আপনি একদিন সবার প্রিয়জন বা গুণীজন হয়ে উঠবেন।
সুযোগ খুজতে ব্যস্ত থাকবেন না, কারও একটু-আধটু বানানের বা ভাষার ভুল ধরতে, এবং সেটা তার কমেন্ট বা টাইমলাইনে পোস্ট করতে।
এমন হলে নতুন কিছু লেখক, তারা নিরাশ হয়ে হাতের কলম ছুড়ে ফেলে দিবে। একদিন সেই ক্ষুদ্র লেখক বাংলার গৌরব হতে পারে।
মানুষের কাছেই মানুষ শিক্ষালাভ করে। তেমন কিছু ভুল-ত্রুটি যদি চোখে পড়ে, তার ইনবক্সে সাক্ষাৎ করে, তাকে উৎসাহিত করে আলোচনার
মাধ্যমে সংশোধন করুন।
ত্রুটি ক্ষমাপ্রার্থী।

Thursday, 25 February 2016

মৃত্যুকে সরণ

মৃত্যুকে সরণ

আব্দুল মান্নান মল্লিক

যে সর্বদা মৃত্যুকে সরণ করে, তার বাসা বেঁধে কি লাভ! বাসা বাঁধতে যতটুকু সময় লাগে, মৃত্যু সেই সময়টুকুর ও অপেক্ষা করেনা।



Wednesday, 24 February 2016

সময়ের মূল্য

সময়ের মূল্য

আব্দুল মান্নান মল্লিক

একদম অপ্রীতিকর পোস্ট করবেন না। শাসন নয়, আমার অনুরোধ। সময় নষ্ট করে দুর্নামের বোঝা মাথায় না নিয়ে, মূল্যবান সময়কে কাজে লাগান। ভালো কিছু লিখুন ও পোস্ট করুন। ভালো বন্ধুদের বন্ধু হয়ে যান। একবার তাকিয়ে দেখুন ঘড়ির দিকে। ঘড়ির কাঁটা কেমন চলছে। ঠিক তেমনি আপনার জীবন থেকে মুল্যবান সময় সরে যাচ্ছে। বিশ্বাস করেন বা নাই করেন, আমি যখন এই কথাটি ভাবি, আমার রাতের ঘুম হারিয়ে যায়।

Saturday, 6 February 2016

অকালসন্ধ্যার কথন

অকালসন্ধ্যার কথন
               ♣
কুড়ি জন লেখকের লেখা এই বইটি। অকালসন্ধ্যার কথন। আমি নিজেও একজন লেখক, তাই আগ বাড়িয়ে বেশী কিছু বলতে চাচ্ছিনা।
হাসি কান্না দিয়ে সাজানো, বিভিন্ন লেখকের মন মাতানো গল্পের এই বইটি। উন্নত মানের মানসম্মান বজায় রেখেই বইটি বাঁধানো হয়েছে।
প্রথমে আমরা যতটা আশা করেছিলাম, বইটি ভালো চলবে, প্রিয় পাঠকদের সহযোগীতায় সেই আশা অতিক্রম করে চলেছে। প্রথমদিন বই না পেয়ে কিছু সংখ্যক বই প্রেমী নিরাশ হয়ে ফিরে এসেছেন, তার জন্য আমরা ভীষণভাবে দুঃখ প্রকাশ করছি।
এখন আর সমস্যা নাই , অতএব প্রিয় পাঠকেরা বইটি সংগ্রহ করে পড়বেন, এবং মাতামত জানাবেন।
প্রিয় লেখক, এবং প্রিয় পাঠক আপনাদের প্রতি আমার আন্তরিক ভালোবাসা শভেচ্ছা রইলো। সঙ্গে শুভকামনা নিরন্তর।
♦♦
গ্রন্থঃ অকালসন্ধ্যার কথন । Okalsondhar Kothon
সম্পাদকঃ আহসান আল আজাদ
ধরনঃ গল্প সংকলন
প্রচ্ছদশিল্পীঃ রাজিব রায়
প্রকাশকঃ আহসান আল আজাদ
প্রকাশনী সংস্থাঃ বাংলার কবিতা প্রকাশন-Banglar Kobita Prokashon
সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি।

Tuesday, 26 January 2016

বিলু ভুতের জীবনী

বিলু ভুতের জীবনী

আব্দুল মান্নান মল্লিক

(*****সম্পূর্ণ কাল্পনিক ঘটনা*****)
♦♦♦♦♦♦♦♦♦♦♦♦♦♦♦♦♦♦♦♦♦♦
বইটি প্রথম প্রকাশ হয়েছিল >২০১৬
সম্পাদক > হেংলা ভুতুম
ছাতিনে তলার পুস্তক প্রকাশন
asd 32, শেওড়া তলা
হাঁড়িগড়া , ধূধূলির মাঠ - ০০১২, ভুতরাজ্য
ইমেল > hht000+♣fals.story

মানুষেরা যেমন , কবিতা, গল্প, নাটক আরও বিভিন্ন ধরণের বই লিখে লেখক বা কবি হয়। আমাদের মধ্যেও কত ভালো ভালো লেখক আছে।
আমার নাম বিলু ভুতুম। ভুতের রাজ্যে আমি সবচেয়ে বড় লেখক। জীবনে অনেক বই লিখেছি। ইচ্ছা হলো ভুতরাজ্যের বাইরে মানুষের কাছে আমার লেখা বই একটা প্রকাশ করব। তাই আমার জীবনী দিয়ে লিখা এই বইটা মানুষদেরকে উপহার দিচ্ছি।
মানুষের সঙ্গে আমাদের চিরদিনের শত্রুতা, আজও মেটেনি। মানুষ আমাদের সাথে কোনোদিনই পেরে ওঠেনি। ওঝা, বদ্যি ওস্তাদ যায় বলনা কেন, এরা আজও আমাদের কিছু করতে পারেনি। এরা আজও আমাদের পিছনে লেগেই আছে। তাই এরাই আমাদের কাছে সবচেয়ে বড় শত্রু। তবে আমরা সহজে কারও ক্ষতি করতে চাইনা, কেউ যখন আমাদের ক্ষতি করে, তাকে আমরা সহজে ছাড়ি না।
আমরা যে কোনো সময় যে কোনো রূপে রূপান্তরিত হতে পারি। মুহূর্তের মধ্যে আমরা, যে কোনো জীবজন্তুর রূপ ধারণ করতে পারি। আবার যখন ইচ্ছা করি, কারও আত্মাকে ঘুম পাড়িয়ে দিয়ে তার দেহে প্রবেশ করি, আমার ইচ্ছা যেটা চায়, তাকে দিয়ে করিয়ে নিয়। সেটা ভালো বা মন্দ যাই হোক, তার ঘাড়েই চেপে যায়।
♥(১) তোমাদের মধ্যে এক নাম করা ওস্তাদ ছিল। তার নাম হেকমত আলি, নিশ্চয় তোমরাও ওস্তাদ হেকমত আলির নাম শুনেছ। আমাদের কাজে বারবার বাঁধা দিয়েছে। অবশেষে আমরা অতিষ্ট হয়ে তার স্ত্রীকে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেলেছি। দিনটা ছিল শনিবার। হেকমত আলির শরীরে প্রবেশ করেছিলাম। সামান্য কারণে তার স্ত্রীর সঙ্গে ঝগড়া বাঁধিয়ে দিলাম। পাড়ার অনেকেই ঝগড়া শুনে ছুটে আসে। এক কথা দু কথা হতে না হতেই তার স্ত্রীকে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে দিয়ে তার শরীর থেকে বেরিয়ে আসি। পাড়ার লোকজনে দেখলো হেকমত আলি তার স্ত্রীকে শ্বাসরুদ্ধ করে মেরে ফেললো। স্ত্রীহত্যার অপরাধে হেকমত আলিকে পাঁচ বছর জেল হেফাযতে থাকতে হয়েছে। হেকমত আলি এখন অস্তাদগিরী ছেড়ে দিয়েছে।
♥(২) কানুর বাড়ির পিছনে একটি ঘন পাতা ভর্তি তেঁতুল গাছ। ধু-ধু রোদ্র, তাই একটু তেঁতুলগাছে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলাম। কানুর বউ হেসিল ঘরে কি সব ভাজা ভুজো করছে । বাতাসে ভেসে আসছে শুটকি মাছের গন্ধ। ভুতেরা শুটকি মাছের গন্ধ পেলে আর স্থির থাকতে পারিনা। তাই একটি বিড়ালের রূপ ধরে ওই হেসিল ঘরে ঢুকে দেখি, তখনো ভাজাভুজো চলছে। আমি কেবলমাত্র মিউ করে ডাকতেই কানুর বউ আমার গায়ে গরম জল ঢেলে দিয়েছিল। আমি বেশ কিছুদিন কষ্ট পেয়েছি। তার জন্য কানুর বউকে এমন খেসারত দিতে হয়েছে, যে আজও চোখের জল ফেলে চলেছে।
কানুর ছোটছোট দুই ছেলে। বড় ছেলের শরীরে আশ্রয় নিয়ে দুই ভায়ে বাড়ির পূর্ব দিকের পুকুরের ধারে খেলতে থাকি। এদিক ওদিক তাকিয়ে আশপাশে কেউ নেই। ছোট ভাইকে দিলাম পুকুরে গড়িয়ে। ভাইটা হাত পা নাড়তে নাড়তে কি সুন্দর জলের মধ্যে তলিয়ে গেল। তারপর আমি কানুর বড় ছেলের দেহ থেকে বেরিয়ে আসি।
♥(৩) পটু রসিক নামে একটি মানুষ ছিল, বেশ বয়স্ক। লাঠির সাহায্যে চলাফেরা করত। বাঁধিয়ে বাঁধিয়ে বেশ গল্প বলতে পারত।  প্রতিদিন সন্ধের পরে পথের ধারে এক বারান্দায় বসে গল্পের আসর জমাতো। আমাদের নামে কুৎসা রটিয়ে বিভিন্ন রকম গল্প বাঁধিয়ে বলতো, আর পাশে যারা শুনতো তারা হো-হো করে হাসত। যেটা আমরা মোটেই সহ্য করতে পারতাম না।
পটু রসিকের দৃষ্টিশক্তি তুলে নিয়েছিলাম। তাইবলে সে অন্ধ হয়ে যায়নি। আমার দৃষ্টি দিয়ে সে দেখতে পেতো। আমি যখন যেটা দেখতাম, সে তাই দেখত। তার খাবার সময় আমি দেখতাম সজনে গাছের পোকা, তার খাবারের থালাতে কিলবিল করত ঐ পোকা। পটু রসিক খাবার ছেড়ে উঠে পড়ত। বাড়ির লোককে বলতো, তোরা আমাকে পোকা খেতে দিয়েছিস? বুড়ো হয়েছি বলে যা ইচ্ছা তাই করবি? এই চললাম, বাড়িতে আর থাকব না, বলে লাঠি ধরে উঠতে যাবে? লাঠিকে দেখতো সাপ। বেচারা একেবারে নাকাল হয়ে গেছিলো। পাড়ার লোকেরা কেউ কেউ বলে, বুড়ো হয়েছে তাই ভীমরতি ধরেছে। এই কথা শুনে পটু রসিক আরও ক্ষেপে উঠলো।  বাড়ির লোকেরা ভাবলো, মাথার কোনো গণ্ডগোল হয়েছে। তাই কনকনে শীতের সময়, বাড়ির লোকেরা ঠাণ্ডা জল ঢেলে ভিজিয়ে দিল পটুর গোটা শরীর। তাতেও যখন সুস্থ হচ্ছে না, তখন মাথায় বরফ চাপিয়ে বেঁধে দিলো।
দুইদিনেই বেচারা মরণাপন্ন।
পটু রসিক বুড়ো মানুষ, তাই দুইদিন কষ্ট দেওয়ার পরে তাকে মুক্তি দিয়েছি। সবাই ভাবল বরফে ভালো কাজ হয়েছে।
♥(৪) সে অনেকদিন আগের কথা। পল্লীসমাজ নামে একটি দলের নেতা ছিলেন গজপতি নাথ। তিনি তার দলবল নিয়ে একদিন মিটিং করে
বলেছিলেন, এবার আমাদের প্রথম প্রকল্প, যত ভুতুড়ে গাছ আছে সব কেটে ফেলতে হবে। শেওড়া,তেঁতুল ও ছাতিনে, এই সব গাছ একটা ও রাখা চলবেনা।
নেতার এই নিষ্ঠুর ভাষণ শুনে আমরা, অর্থাৎ ভুতেরা চরম ক্ষুব্ধ হয়েছিলাম। মানুষেরা যদি এইভাবে আমাদের উপর অত্যাচার করে, তাহলে আমরা থাকবো কোথায়? ঠিক আছে দেখাচ্ছি মজা।
নেতার পরবর্তী মিটিং হাসিম নগরে। প্রচুর মানুষের সমাগম। আমরা জনা চারেক ভুত ঐ মিটিং-এ উপস্থিত হয়। নেতার ভাষণ দেওয়ার পূর্ব মুহুর্তে আমি উনার শরীরে প্রবেশ করি। এবার জনগণ চোখে দেখবে নেতাকে , আর ভাষণ দিবো আমি।
স্টেজে উঠতেই চারিদিকে হাত তালি পড়তে লাগলো। আমি হাতের ইশারা দিয়ে সবাইকে শান্ত হয়ে বসতে বললাম। সবাই ভাষণ শুনতে চুপচাপ বসে পড়লো।
শুরুতেই বক্তব্য রাখলাম-
বন্ধুগণ, আমরা আজ এখানে সবাই উপস্থিত হয়েছি নতুন যোজনা বিকাশের জন্য। আমাদের এলাকার পরিস্থিতি উন্নতির দিকে এগিয়ে চলেছ। আমরা সবাই ধনী, মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যক মানুষ এখনো দারিদ্র্যতায় জীবন যাপন করছে। আজ যদি এই মানুষগুলো না থাকতো, দেশের মর্যাদা অনেক বেড়ে যেতো। বাইরের কোনো দেশে আমরা মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারিনা। আমরা গর্ব করে বলতে পারিনা, যে আমাদের দেশের সবাই ধনি। এর জন্য আমাদের এলাকার মানসম্মানের হানি হয়।
তাই আমরা নতুন করে উদ্যোগ নিয়েছি , বিনা পয়সাতে বিষ বিতরণ। বিষের দোকানে নিজের নাম সাক্ষর করলেই দোকানদার ২৫ গ্রাম পরিমাণ মতো বিষ দিয়ে দিবে। এটা তারাই পাবে, যারা দারিদ্র্যতায় জীবন যাপন করছে। আজ থেকে এক মাসের মধ্যে, প্রতিটা গরীব মানুষকে এই বিষ খেয়ে আত্মহত্যা করতে হবে। যে না করবে তাকে দাঁড় করিয়ে গুলি করে হত্যা করা হবে।
নেতার এই অবৈধ অশ্লীল ভাষণ শুনে এলাকার জনগণ ক্ষেপে উঠলো। কিন্তু প্রতিবাদ করতে কেউ সাহস পাচ্ছিল না।
মানুষের রূপে বসে থাকা আমার সঙ্গী তিনজন হৈ-হুল্লোর শুরু করে দিতেই, জনগণ সবাই স্টেজ ভেঙে নেতা গজপতি নাথকে টেনে নিচে নামিয়ে বেদম মারপিট আরম্ভ করে দিল। মারপিট আরম্ভের মুহুর্তে ওর শরীর থেকে বেরিয়ে আসি। বেচারা গজপতি নাথ মারের কারণ কিছুই বুঝতে পারলেননা।

♣ ( বিশেষ দ্রষ্টব্য, আমার এই বইটা মানুষের কাছে পৌছে দেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, তোমরা আমাদেরকে আমাদের মতো থাকতে দাও, আর তোমরা তোমাদের মতো থাকো। আমাদের স্বাধীনতার ব্যাঘাত ঘটালে তোমাদেরও ওই হাল হবে। )

Tuesday, 19 January 2016

অধম মধ্যম উত্তম

অধম মধ্যম উত্তম

আব্দুল মান্নান মল্লিক

( ১ ) কোনো এক ব্যক্তি , যে ব্যক্তি অপরকে ঠকিয়ে দশ হাজার টাকার ধান্দা করলো। হঠাৎ ঐ ব্যক্তি রোগাক্রান্ত হয়ে পড়ে। ডাক্তার ও ঔষধ পত্রে বিশ হাজার টাকা খরচা করে রোগমুক্ত হল। সে মনেমনে ভাবতে লাগলো, লোক ঠকানো ঐ দশ হাজার টকা যদি না থাকতো, তাহলে আমি রোগমুক্ত হতে পারতাম না। অকালেই মৃত্যুকে মেনে নিতে হতো। আমার কাছে ছিল মাত্র দশ হাজার টাকা।
( ২ ) ঐ রকম এক অপর ব্যক্তি, তারও একই হাল হয়েছিল, কিন্ত এই ব্যক্তি অনুতপ্ত হল ও ভাবতে লাগলো, এটা আমার পাপের ফল, লোক ঠকিয়ে দশ হাজার টাকার ধান্দা যদি না করতাম, তাহলে আমার কোনো রোগই হতো না। আমার নিজস্ব দশ হাজার টাকা আমার কাছেই থেকে যেতো।
( ৩ ) অন্য এক ব্যক্তি সে ভাবতে লাগলো , আমি ভালোই আছি। ঐ দুই ধরণের প্রতারক, আমি কাউকেই পছন্দ করিনা।

( একটা ঘটনাকে কেন্দ্র করে, যে যেমন প্রকৃতির ব্যক্তি, সে সেইরকমই মন্তব্য করে বসে। )
♥♥
১ নং অধম, ২ নং মধ্যম, ৩ নং উত্তম।