Thursday, 17 November 2016

মা

মা

আব্দুল মান্নান মল্লিক

তখন আমার বয়স দেড় মাস। খুব বড় না হলেও খুব ছোটো ছিলনা সেই বীলটি। ওপারে জল ছেড়ে বালিয়াড়ির উপর কাশবন, আর এপারে পাড়ের উপর বিভিন্ন জাতের বড়বড় গাছ, আর নিচে ছোট ছোট আগাছায় ভরা। একটি বড়সড় পিটুলি গাছে ছিল আমাদের বাসা। ওটাই আমার জন্মস্থান। শুধু মা আর আমি। গায়ের রঙ কালো বলে অন্যান্য পাখিরা আমাদের সঙ্গে মিশতে চায়না।
মাঝভর শীতকাল। যখন আমি ডিম ফুটে বেরিয়ে আসি পৃথিবীর আলোতে, তখনও আমার কাছে গোটা পৃথিবীটা অন্ধকার। দুই-তিনদিনের মধ্যেই আমার চক্ষু আস্তে আস্তে খুলে যায়। সেদিনই আমার প্রথম সূর্যের আলো দেখা। সেদিনের কথা আজও খুব মনে পড়ে। মা কোথায় থেকে মাছ ধরে এনে অর্ধ-পরিপাকে মুখ উগড়ে আমাকে খাওয়াত।
একদিন মা আমার খাবারের সন্ধানে বাসা ছেড়ে বেরিয়ে পড়েছে। অল্প কিছুক্ষণ পর পাড়ার কতগুলো চেঙড়া ছোঁড়ারা গাছের গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে বলাবলি করছে, মনে হয় বাসাটায় বাচ্চা আছে। একজন বলল এখনি গাছে উঠে পেড়ে নিয়ে আসি। বলতে বলতেই চেঙড়াটা গাছে উঠে পড়ে। আমাদের বাসাটা ছিল একটি সরু ডালে। ভেঙে যাওয়ার ভয়ে চেঙড়া ছোঁড়া আমার কাছে পৌঁছাতে না পেরে ডালটা জোর নড়াতে থাকে। আমি পায়ের নখ দিয়ে বাসার খড়কুটো আঁকড়ে ধরে থাকি, আবার কোনোকোনো সময় নিরুপায় হয়ে ঝুলে পড়ি। অবশেষে ধরে রাখার ক্ষমতা আর ধরে রাখতে না পেরে বাসা থাকে বিচ্ছেদ হয়ে জলের উপর পড়ে গেলাম। গাছের গোঁড়ায় দাঁড়িয়ে থাকা ছোড়ারা আমাকে লক্ষ্য করে ঢিল ছুড়তে লাগলো। আমি তখন প্রাণের ভয়ে জলের উপর ডানা ঝাপটিয়ে ঝাপটিয়ে ওপারে বালিয়াড়িতে উঠে আসি। এমনিতে শীতকাল তার উপর ঠাণ্ডা জলে এতক্ষণ সাঁতার কেটেছি। মনে হচ্ছে সারা শরীর শীতে জমে গেছে। ক্লান্তও হয়েছি বেশ। মৃদু তপ্ত বালি আর মৃদু সূর্যের তাপ গায়ে লাগায় বেশ আরাম বোধ করছি। ধীরেধীরে ক্লান্ত সেরে উঠতেই ওপারে তাকিয়ে দেখি কখনো ফেলে আসা বাসাতে কখনো গাছের মাথায় মাথায়, মা আমাকে হন্যি হয়ে খুজে বেড়াচ্ছে। আমি মাকে সাড়া দিতে চিৎকার করছি, সেই চিৎকার এপার হতে ওপারে মায়ের কাছে কিছুতেই পৌঁছয়না।
এপার থেকে আমি মাকে দেখতে পাচ্ছি, পাগলের মতো খুজে বেড়াচ্ছে। ক্লান্ত হয়ে মা কদম গাছের মাথায় বসে চারিদিক চোখ মেলে খুজতে থাকে।
হঠাৎ চোখ পড়ে গেল আমার দিকে। মা পাগলিনী হয়ে ছুটে এসে বসল আমার কাছে। তখনো মায়ের চোখে জল ছলছল করছে। গলায় গলা পেঁচিয়ে, ঠোটে ঠোট মিলিয়ে কত আদর করল মা আমাকে। সেদিন থেকে বুঝে গেছি সন্তানের প্রতি মায়ের কত মমতা। এরপর থেকে বাসা ছাড়াই মা আমাকে খাইয়ে দাইয়ে বড় করে তুলেছে। বিপদ সম্ভাবনায় মা আমাকে নিয়ে লুকিয়ে পড়তো কাশবনের ভিতর। বীলের জলে ডুবিয়ে ডুবিয়ে মাঝ ধরে খাওয়াত, আমাকে জলে নামতে দিতো না।
কাশবনের ভিতরে মা আর আমি নিরাপদে থাকার মতো জায়গা করেছিলাম। একদিন রাতের বেলায় এক বনবিড়াল হানা দিয়ে মাকে ধরে নিয়ে যায়। কান পেতে শুনি পাশে কোথায় ছটফট শব্দ। বুঝতে পারলাম মা বনবিড়ালের হাত থেকে বাঁচার প্রাণপণ চেষ্টা করছে। একসময় ছটফট শব্দ বন্ধ হয়ে গেল। সারারাত মায়ের চিন্তায় কেটে গেল। ভোরে উঠে খুঁজাখুঁজি করে পাশে এক জায়গায় খুজে পেলাম বনবিড়ালে খাওয়া মায়ের অবশিষ্ট অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।

Tuesday, 8 November 2016

আশার আলেয়া

আশার আলেয়া

আব্দুল মান্নান মল্লিক

পরিশ্রমের অধিক মূল্য অস্থায়ী। স্বল্প পরিশ্রমের স্বল্প মূল্যই যথেষ্ট। অধিক পরিশ্রমে স্বল্প মূল্যও একদিন পূর্ণতা লাভ করবে। তেমনি স্বল্প পরিশ্রমের অধিক মূল্যের কারণে একদিন সবটাই হারাবে। পরিশ্রম ও মূল্য পাশাপাশি হেঁটে চলে, মনে রেখো।

Wednesday, 5 October 2016

মায়ের ভূমিকা

মায়ের ভূমিকা

আব্দুল মান্নান মল্লিক

বেশ কয়েক বছর কেটে গেছে , বউ এর নালিশে ছেলে মায়ের গলায় কাটারি বাঁধিয়ে টান দিতেই
মায়ের গলাটা সম্পূর্ণ না কাটলেও বেশ কিছুটা কেটে যায়। অঝরে রক্ত ঝরতে থাকে। মা অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে থানা থেকে পুলিশ এসে ছেলেকে ধরে নিয়ে যায়। গ্রামের লোকজন তার মাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। মায়ের জ্ঞান ফিরতেই শুনতে পাই তার সেই খুনি ছেলেকে পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে। মায়ের কি কান্না, কেউ আর থামাতে পারেনা।
মা কান্নার সাথে বারবার বলে চলেছে, ওগো, কে আছো তোমরা, শিগগির আমার ছেলেকে ছাড়িয়ে নিয়ে এসো, আমার ছেলে পুলিশের মার কিছুতেই সহ্য করতে পারবেনা।
( ! আহারে মায়ের প্রাণ। সন্তান যতই অন্যায় করুক, সন্তানের কষ্ট মা কিছুতেই সহ্য করতে পারে না। আজও কেউ খুজে পাইনি মমতাময়ী মায়ের মমতার গভীরতা। এসো আমরা সবাই  কায়মনোবাক্যে মায়ের প্রার্থনা করি। )

Wednesday, 7 September 2016

প্রত্যাগত দেবীমাতা

আব্দুল মান্নান মল্লিক

সঙ্কট তরিকায় মাগো করেছ দেরি
পড়লো মনে আজ বুঝি বাবার বাড়ি
সামগ্রী উপকরণ যত তোমারি জন্য
তোমার আগমনে মাগো আমরা ধন্য
পদতলে দিও মাগো একটুখানি ঠাঁই
সঙ্কটকালে কর উদ্ধার বড় অসহায়
দশভুজি রণসজ্জায় স্বসস্ত্র বজ্রমুঠে
অবসান কর পাপের পূজিব একনিষ্ঠে
এইটুকু দাবি মোদের তোমার নিকট
অভিযোগ কর গ্রহন হয়োনা বিকট
মুছে দাও গ্লানি যত জাতি ভেদাভেদ
সন্তান তোমারি মানুষ তবুও বিভেদ
সর্বনাশা সবার সাথে অসুরের দল
বিচরণ দিনে-রাতে স্বর্গ মর্ত্য ভূতল
অচ্ছেদনে আজও তারা দৈত্য অসুর
কেন তবে আজ মানুষ অধিক নিষ্ঠুর
নাহি হত ভাগাভাগি হিন্দু মুসলমান
সূচনায় হয়ে যেত অসুরের অবসান
ধীক্কারি যুম্বাসুর বালা জারজ অজম
জন্তু-দানব আলিঙ্গনের বংশ জনম্
কর মাগো আজ তুমি ওদের নিধন
নইলে অনলে দহন হইবে ত্রিভূবণ।
কন্ধরে ধোতি-প্রান্ত করি করজোড়
অস্ত্রাঘাতে কর মাগো অসুর নশ্বর্
আরাধনায় হয়ে যদি অণুমাত্র চ্যুতি
ক্ষমা করে দাও মাগো সেবাতে ত্রুটি

Friday, 19 August 2016

স্মরণীয় দিনটি

স্মরণীয় দিনটি

আব্দুল মান্নান মল্লিক

১৮ই আগস্ট ২০১৬। রাখিবন্ধন উৎসব।
পূর্বপরিকল্পিত ভাবে আমরা ঐতিহ্য গ্রুপের পক্ষ থেকে রাখিবন্ধন উৎসব পালন করতে বেরিছিলাম। খুব সুন্দরভাবে আমরা সফলতা অর্জন করেছি।
সাড়ে চারটে নাগাদ আমরা প্রথমে কৃষ্ণনগর শ্রীরামকৃষ্ণ আশ্রমে পৌঁছয়।
আশ্রমের অনাথ ছেলেরা শ্রীরামকৃষ্ণের নীতি অনুসরণ করে আমাদের সামনে সারিবদ্ধ ভাবে দাঁড়িয়ে, শ্রীরামকৃষ্ণের বাণী পাঠ করে। আমরা, অর্থাৎ ঐতিহ্য গ্রুপ থেকে অনাথদেরকে খাতা, কলম সম্প্রদান করার পর রাখিবন্ধন কার্য সম্পূর্ণ করি।
এরপর আমরা গেলাম হরিশপুর মা সারদা শিশুকন্যা তীর্থে। আনুমানিক ৩০০ অনাথ শিশুকন্যা শৃঙ্খলাবদ্ধে পথ চেয়ে দাঁড়িয়ে ছিল আমাদের অপেক্ষায়।
জানিনা তাদের অতীত ইতিহাস, তবুও হৃদয়ের কোনো এক গভীর কোণে এই অনাথদের অতীত কল্পনার ছাপ পড়ে। কষ্টে অশ্রুকে সংবরণ করে হাসি মুখে তাদের সঙ্গে সহৃদয়তা প্রকাশ করি।
তাদের সঙ্গে আলাপ আলোচনার পরে সব স্বাভাবিক হয়ে যায়।
এরপর আমরা রাখি বন্ধনের কাজ শুরু করি। শিশুকন্যাদের প্রত্যেককে খাতা কলম ও চকলেট দেওয়ার পরে রাখি বন্ধন কার্য সম্পূর্ণ হয়। প্রত্যেকের মুখে হাসি দেখতে পেয়ে, আমরা নিজেকেও খুশি রাখতে পেরেছি।
এখানকার সমস্ত কিছু সফলতার সাথে সম্পূর্ণ করার পরে, আমরা বেরিয়ে পড়ি শিবরাম মেমোরিয়াল বৃদ্ধাশ্রমের উদ্দেশ্যে।
যথাসময়ে বৃদ্ধাশ্রমে পৌছেছিলাম। দেখতে পেলাম জনা দশেক বৃদ্ধা মায়েদের। কেউবা বিষণ্ণতায় কেউবা রসিকতায়। মনে হল এই মায়েরা একে অপরের সুখ-দুঃখ বিনিময় করে মানসিক সমতা বজাই রেখেই জীবন ধারণ করে আসছেন। সবার সঙ্গে আমরা সবাই পরিচিত হলাম।
আমাদের ঐতিহ্যের পক্ষ থেকে রবীন্দ্র সংগীত, নাচ ও কবিতা আবৃতির মধ্য দিয়ে যতটা সম্ভব মায়েদেরকে আনন্দ দান করেছি ও সফলতার সাথে রাখি বন্ধনের কাজ সম্পূর্ণ করে এখানেই আমাদের কর্মসূচি সমাপ্তি করেছি।



Wednesday, 10 August 2016

হৃদয়ের ব্যক্ত কথা

 হৃদয়ের ব্যক্ত কথা

আব্দুল মান্নান মল্লিক

১ / পরিবেশ মানুষকে বদলাই না, মানুষ পরিবেশকে বদলাই।
২ / খুশির খবরে আনন্দের সীমা ছাড়ানো মানে দুঃখ আসন্ন।
৩ / পরিশ্রমের অধিক আশা করা, মানে অমঙ্গলকে আহ্বান করা।
৪ / সমাজকে কলুষিত করা, পরবর্তী প্রজন্মকে আগুনে ঠেলে দেওয়া সমান।
৫ / অপরের দুর্দিনে তৃপ্তি অনুভব, মানে নিজের চলতি পথে কাঁটা বিছানো।
৬ / অন্যের সমৃদ্ধিতে ঈর্ষান্বিত হওয়া, মানে অগ্নি সংযোগে নিজেকে জ্বালানো।



সারা জগৎ ঘুরে মর সুখ যে কোথায় আছে,
নিজের মনে সুখের খবর সুখ কি ধরে গাছে?

Sunday, 3 July 2016

লেখক ও পাঠক পাঠিকা

লেখক ও পাঠক পাঠিকা

আব্দুল মান্নান মল্লিক

গাছ মাটিতে পুতে দেওয়া খুবই সহজ কিন্তু, বাঁচিয়ে রাখাটা খুবই কঠিন।
তেমনি লিখালিখি যতটা সহজ, বাঁচিয়ে রাখাটা খুবই কঠিন। বাঁচিয়ে রাখতে পারে একমাত্র পাঠক পাঠিকা।